• ঢাকা শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫

মামলার বাদীই যখন খুনি

স্টাফ রিপোর্টার, কুষ্টিয়া
|  ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২২:৪৯ | আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:০৬
৩১ বছর আগে এক সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন নূর মোহাম্মদ। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বংশীতলা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। এ হত্যা মামলার বাদী নিজেই খুন করেছেন নূর মোহাম্মদকে! প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ জনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুন করা হয় তাকে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। 

কুষ্টিয়ায় ৩১ বছর পর নূর মোহাম্মদ হত্যারহস্য উন্মোচন করলো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যা মামলা থেকে নিজেকে বাঁচাতে খুনি মাজেদ আলীই বাদী হন ওই খুনের মামলায়। 

এই রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জিয়ারখী ইউনিয়নের বংশীতলা গ্রামে। ওই গ্রামের ঘরজামাই নূর মোহাম্মদ ৩১ বছর আগে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন।

পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মামলা করা হয়। মামলার বাদী হন খুনি নিজেই। মামলার তদন্ত হয়েছে একাধিকবার। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্নসহ সংস্থা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে কোনও কুল কিনারা করতে পারেনি। তিন দশকেরও বেশি সময় পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যরা। 
তদন্তে বেরিয়ে আসে, মামলার বাদী নিজেই খুন করেন নূর মোহাম্মদকে! প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ জন মিলে খুন করে তাকে।
------------------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : ধরলা নদীতে ধরা পড়ল ১শ’ কেজি ওজনের ডলফিন
------------------------------------------------------------------

পিবিআই’র এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, দরিদ্র নূর মোহাম্মদ শ্বশুরবাড়ি বংশীতলা গ্রামে বসবাস করতেন। সেখানে মাজেদ আলী জোয়ারদার ও আলতাফ মোল্লা নামে দুইজন গ্রাম্য মোড়লের মধ্যে বিবাদ চলে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। মাজেদ আলী জোয়ারদার বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন নূর মোহাম্মদ। ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় খুন হন নূর মোহাম্মদ। এ ঘটনার পরদিন ২৫ জুন কুষ্টিয়া সদর থানায় মাজেদ আলী (খুনি) বাদী হয়ে হত্যা মামলা (মামলা নং-২৬) দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় প্রতিপক্ষ আলতাফ মোল্লাসহ ১৩ জনকে। কিন্তু কুষ্টিয়া সদর থানার পুলিশ, এসবি, সিআইডি বার বার তদন্ত করেও নূর মোহাম্মদ হত্যা রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ওই মালায় তদন্ত করতেই কেটে যায় ৩০টি বছর।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই মাস পর মামলাটি পুলিশের তদন্তকারী সংস্থা (সিআইডি) তে হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক মাস পর নূর মোহাম্মদের স্ত্রী তহরান্নেসা ‘তদন্ত সঠিক হচ্ছে না’ মর্মে অভিযোগ এনে আদালতে ফৌজদারি মিস মামলা দায়ের করেন। ছয় মাস শুনানি শেষে আদালত সেই অভিযোগ খারিজ করে দেন।

তদন্তের সময় বাড়ানোর জন্য সিআইডি কর্মকর্তা আদালতের কাছে দুই মাস সময় বৃদ্ধির অনুমতি চায়। আদালত এক মাস সময় মঞ্জুর করে আদেশ দেন। এরপর নূর মোহাম্মদের স্ত্রী ‘তদন্ত সঠিক হচ্ছে না’ ও ‘তদন্ত সময় এক মাস বৃদ্ধি’ আদেশ দুইটির বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন করতে আদালতে আবেদন করেন এবং রিভিশন চলাকালীন মামলার ডকেট আদালতে রাখতে চান।

আবেদন অনুযায়ী আদালতের নির্দেশে কেস ডকেট সিআইডি থেকে আদালতের হেফাজতে চলে আসে। রিভিশন মামলা দুইটির প্রায় ছয় বছর শুনানি শেষে হাইকোর্ট জেলা আদালতের পক্ষেই রায় দেন। এরপর সিআইডি আবার মামলার তদন্ত শুরু করে। এরপর সিআইডি নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুলকে দিয়ে কুষ্টিয়া সদর থানায় আরেকটি নতুন হত্যা মামলা দায়ের করায়। এ মামলায় আগের মামলার বাদী মাজেদসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। একইদিন সিআইডি আগের মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠায়। ওই রিপোর্টে আলতাফসহ অন্য আসামিদের অব্যাহতি দেয়া হয়।

এদিকে, প্রথম মামলার বাদী মাজেদ সিআইডি’র ফাইনাল রিপোর্টের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নারাজি দেন। নিয়ম অনুযায়ী একই ঘটনায় দুইটি মামলা চলতে পারে না। ফলে দ্বিতীয় মামলাটির তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। সেসময় মাজেদ নূর মোহাম্মদ খুনের ন্যায়বিচারের জন্য নারাজি, আপিল, রিভিশন ও আদালত পরিবর্তনসহ বিভিন্ন পন্থায় চেষ্টা করতে থাকেন। 

অপরদিকে, নূর মোহাম্মদের স্ত্রীসহ তার পরিবার ততদিনে বিচারের সব আশাই ছেড়ে দেয়। বর্তমানে খুনি মাজেদের বয়স ৯০ বছর। মৃত্যুশয্যায় থাকা মাজেদ আদালতেও যান না। এ বিষয়ে সব তদবির থেমে যাওয়ায় গত বছর আদালত ১ম মামলার ফাইনাল রিপোর্টটি গ্রহণ করেন এবং নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুলের দায়ের করা ২য় মামলাটির তদন্ত পিবিআই’তে দেন।

এর পর খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় তিন দশক আগের একটি খুনের ঘটনায় পিবিআই প্রমাণ পায় প্রথম মামলার বাদী মাজেদ আলীর প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও উপস্থিতিতে ১০ জন মিলে নূর মোহাম্মদকে খুন করা হয়। খুনের আগ মুহূর্তে অন্ধকারে চিৎকার করে গ্রামে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেন কোনও সাক্ষী না থাকে। খুনি মাজেদ আলীই নূর মোহাম্মদের স্ত্রীকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে নিজে মামলার বাদী হন। 

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন।

ঘটনার বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নূর মোহাম্মদ খুনের ঘটনায় পিবিআই ইতোমধ্যে মাজেদ আলী জোয়ারদারসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিয়েছে। অন্য দুইজন বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন। বাকি আটজনের অনেকেই মাজেদ আলীর মতো মৃত্যুশয্যায় রয়েছেন। 
আসামিদের গ্রেপ্তার করার জন্য পিবিআই পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন  :

এসএস 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়