নিজ দেশের নাগরিকত্ব চান রোহিঙ্গারা, স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ

প্রকাশ | ২৫ আগস্ট ২০১৮, ২১:৫৩ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৮, ২২:৫৫

টেকনাফ প্রতিনিধি

মিয়ানমারের আরাকানে গেলো বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সে দেশের সেনা কর্তৃক হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের একবছর পূর্ণ হওয়ায় শোক দিবস হিসেবে পালন করছে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা। এ উপলক্ষে উখিয়া-টেকনাফে গড়ে ওঠা ক্যাম্পগুলোর আশ্রিত রোহিঙ্গারা ২৫ আগস্টকে কালো দিবস ঘোষণা করে শনিবার সকাল থেকে বিচার চেয়ে প্রতিবাদ, আলোচনা সভা ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে।

বিক্ষোভ মিছিলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নরনারী অংশগ্রহণ করেন। এসময় রোহিঙ্গা মৌলভীদের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। বিক্ষোভ মিছিলে সমাগত রোহিঙ্গারা হাত তুলে বিভিন্ন স্লোগানে পুরো ক্যাম্প মুখরিত করে তোলেন। এছাড়া ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সমাবেশের আয়োজন করে রোহিঙ্গারা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট  রাখাইন (আরাকান) রাজ্যের ৩০ সরকারি সামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগে মিয়ানমার সরকারি বাহিনী রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর বর্বর হামলা চালায়। মিয়ানমার সরকার এ ঘটনার জন্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) বা আল-ইয়াকিন নামক রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনকে দায়ী করে।

এর পর পরই মিয়ানমার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উগ্র বৌদ্ধরা মুসলিম বসতির উপর আক্রমণ শুরু করে। নারী ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে আগুন, লুটতরাজ, মসজিদ-মাদরাসায় আগুন ধরিয়ে দেয়। হত্যা করে শিশু থেকে বৃদ্ধ। ধর্মীয় নেতাদের পুড়িয়ে মারে। শত শত যুবককে আটক করে গণকবর দেয়ারও অভিযোগ করে রোহিঙ্গারা। গণহত্যার মতো অপরাধ, নারী ও শিশু ধর্ষণ থেকে বাচঁতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। টেকনাফ-উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে পাহাড়ি পথ, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। গত এক বছরে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা ২৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ২০১৬ সালের নয় অক্টোবর অপর একটি হামলার ঘটনার জের ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি জমায়। এর আগে ১৯৯১ সালে আরেকদফা আড়াই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। তবে পরের বছর থেকে এদের মিয়ানমার ফেরত নেয়া শুরু করায় প্রায় দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা স্বদেশে ফেরত যায়। তখন থেকে উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়াতে প্রায় ২৪ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা রয়ে যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সর্বশেষ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের যে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সেখানে নতুন পুরাতন মিলে প্রায় সোয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা তালিকাভুক্ত হয়। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে গেলো বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও গেল জুন মাসের দিকে মিয়ানমার ও ইউএন চুক্তিবদ্ধ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইচ মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে একটি টিম আরাকান সফর করে আসেন। এ টিমের সদস্য বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, একটি ট্রানজিট জেটি ও দুটি ট্রানজিট হাউস ছাড়া এখনও কিছুই তৈরি করেনি মিয়ানমার। রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে তাদের নিজস্ব বাড়ি-ঘরে ফিরে যেতে পারে সেই পরিবেশ সেখানে এখনও গড়ে ওঠেনি। অপরদিকে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলার অং সান সু চি সিঙ্গাপুরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোগের অভাবের কারণে তা হচ্ছে না।

    আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি মিয়ানমার সরকারের বিচার চেয়ে নিজ দেশে ফেরার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ-সমাবেশ করে

এদিকে ২৫ আগস্টকে ‘কালো দিবস’ ঘোষণা করে নানা কর্মসূচি পালন করেছে রোহিঙ্গারা। কর্মসূচির মধ্যে ছিল প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলে প্লেকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে মিয়ানমার সরকারের বিচার চাই স্লোগানে কক্সবাজার টেকনাফ মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

রোহিঙ্গা নেতা জাকারিয়া বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও এ দেশের সেনা, বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও উখিয়া টেকনাফের মানুষের প্রতি ধন্যবাদ জানান। সেইসঙ্গে তারা নিজেদের দেশে নাগরিক অধিকার নিয়ে ফিরতে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন বলে জানান।

টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রণজিত কুমার বড়ুয়া জানান, অনুমতি সাপেক্ষে রোহিঙ্গারা প্রতিবাদ সমাবেশ ও শোক পালন করছে। তবুও অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

জেবি/পি