• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

বিনিময়ের ৩ বছর পূর্তি

ছিটমহলে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উন্নয়ন

আব্দুল কুদ্দুস চঞ্চল, কুড়িগ্রাম (উত্তর)
|  ৩১ জুলাই ২০১৮, ১২:৪২ | আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৮, ০৯:৫৫
আজ ছিটমহল বিনিময়ের তিন বছর পূর্তি। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বিনিময় ঘটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ও ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশি ৫১টি ছিটমহলের। বিনিময়ের পর ছিটমহলগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মিশে গিয়ে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটে।

১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তি, ১৯৮২ তে এরশাদ-ইন্দিরা সমঝোতা স্বাক্ষর, পরবর্তীতে ২০১১ সালে হাসিনা-মনমোহন প্রটোকল চুক্তি এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালের সাত জুন ঢাকায় হাসিনা-মোদির বৈঠকে সমাধান ঘটে দুদেশের ১৬২টি ছিটমহলের সমস্যা। চুক্তি অনুযায়ী, ৩১ জুলাই মধ্যরাতে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় দুদেশের অভ্যন্তরে থাকা ছিটমহলগুলো।

বিনিময়ের পর কুড়িগ্রামের ১২টি ছিটমহলসহ ১১১ ছিটমহলের ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সবচেয়ে বড় ছিটমহল দাসিয়ারছড়াসহ ১২টি ছিটমহলের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। স্কুল-মাদরাসা, রাস্তা, বিদ্যুত, মসজিদ-মন্দির, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, ব্রিজ কালভার্টসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে।৬৮ বছরের বঞ্চিত ছিটমহলবাসী দেশের মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে সমতায় এসেছে।

দাসিয়ারছড়ায় নির্মিত হয়েছে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অনুমোদন পেয়েছে বেশ কয়েকটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা। এখন আর শিক্ষা বঞ্চিত নয় এখানকার ছেলে-মেয়েরা। প্রতিটি পরিবারের ছেলে-মেয়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্মিত হয়েছে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা, শতভাগ বিদ্যুতায়ন, ইন্টারনেট সংযোগ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ কৃষি ক্ষেত্রেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন  : সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড না হলে আরও বেশি ভোট পেতাম : আরিফুল
--------------------------------------------------------

এখন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা তার সবই পাচ্ছে সাবেক ছিটমহলের অধিবাসীরা।

কুড়িগ্রাম এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গত দুবছরে বিশেষ বরাদ্দে প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। এর মধ্যে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কালিরহাটে কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টার, ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, দুই কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি হতদরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ি নির্মাণ উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিরসন হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন এক হাজার ছয়শ ৪৩ দশমিক ৪৪ একর ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত নয় একর জমির প্রাক জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে।

ছিটমহল বিনিময়ের ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার পাঁচশ ৬২ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। কৃষি জমি সেচের আওতায় আনতে স্থাপন করা হয়েছে গভীর নলকূপ। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্থাপন করেছে সৌর বিদ্যুৎ পদ্ধতিতে সেচ ব্যবস্থা।

ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫টি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪টি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্র। উপজেলা কৃষি অফিসের অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। দাসিয়ারছড়ায় ঘরে ঘরে সুপেয় পানি আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বেকার যুব ও যুব মহিলাদের নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

দাসিয়ারছড়া বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এগুলো হলো দাসিয়ারছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, দাসিয়ারছড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, দাসিয়ারছড়া সমন্বয়পাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মইনুল হক নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মিশকাত আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ফজিলাতুন্নেছা দাখিল মাদরাসা। এই ছয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাসিয়ারছড়ার প্রায় সাতশ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে।

দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম, আব্দুল হাকিম, আব্দুল জলিল, নুর আলম মাস্টার জানান, এখন তারা বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় দিতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত।

তবে সর্ববৃহৎ ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় প্রায় ছয় হাজার লোক বাস করলেও পৃথক ইউনিয়নের দাবি উপেক্ষিত থেকেছে। ইউনিয়নের দাবিতে অনেক আন্দোলন করেও লাভ হয়নি। সংলগ্ন তিনটি ইউনিয়নের সঙ্গে দাসিয়ারছড়াকে একীভূত করে দেয়া হয়েছে। এতে নিজেদের নেতা নির্বাচন করার অধিকার হারিয়েছেন তারা। ফলে তারা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবার আশঙ্কায় আছেন।

স্থানীয় কৃষক মানিক মিয়া আরটিভি অনলাইনকে বলেন- ‘হামার নিজের একটা ইউনিয়ন আর চেয়ারম্যান পাইলোং না।’

সাবেক ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা ও মইনুল হক আরটিভি অনলাইনকে বলেন- ‘আমাদের প্রাণের দাবি দাসিয়ারছড়া ইউনিয়ন ঘোষণা না হলেও যেভাবে উন্নয়ন কাজ তিন বছরে হয়েছে তাতেই আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।’

এ প্রসঙ্গে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও আরটিভি অনলাইনকে বলেন- ‘বিলুপ্ত ছিটমহলের অবরুদ্ধ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। এছাড়াও গত তিন বছরে বিলুপ্ত ছিটমহলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নের কাজ চলতে থাকবে।’

ছিটমহল বিনিময়ের তিন বছর পূর্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা। সন্ধ্যার পর হবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্জ্বালন, প্রতিটি বাড়িতে আলোক সজ্জাসহ মসজিদে মিলাদ মাহফিল, মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।

আরও পড়ুন  :

জেবি/পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়