ভরা মৌসুমে ইলিশ গেলো কই?

প্রকাশ | ৩১ জুলাই ২০১৮, ১১:২১ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০১৮, ১৮:৪৩

মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী

‘মোরা ১৫-২০ বছর ধইরা গাঙে (নদী ও সাগরে) মাছ ধরতাছি। কিন্তু এরহোম ইলিশের আহাল দেহি নাই কহোনও। এই এক মাসে যেই কয়ডা ইলিশ জালে পাইছি, হেইয়া দিয়া ঘর-সংসার চালামু, না দাদনের টেহা দিমু। গাঙে এই রহম ইলিশের আহাল থাইকলে মোগো বউ-বাচ্চা লইয়া ক্যামনে চলমু, অ্যাতে তো না খাইয়া মরণ লাগবো।’

চরম হতাশার সঙ্গে কথাগুলো বলেন পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকা কলাপাড়ার জেলে আবদুস সোবাহান (৪৫)। শুধু সোবাহানই নয়, একইরকম হতাশা জেলে রুস্তুম আলী (৪২), সেকান্দার আলী (৪৭), রাঙ্গাবালীর জেলে আবদুর রহমান (৪২) ও শহিদুল ইসলামের (৫২)।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলায় ৬৯ হাজার ছয়শ ৬০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জেলে রয়েছে কলাপাড়া উপজেলায়। এ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ হাজার চারশ ৫৬ জন। এছাড়া রাঙ্গাবালীতে ১৩ হাজার আটশ ১৯ জন, গলাচিপায় ১২ হাজার  ছয়শ ৪১ জন, দশমিনায় ১০ হাজার একশ ৭১ জন, বাউফলে ছয় হাজার একশ ৮০ জন, মির্জাগঞ্জে এক হাজার আটশ ৮৯ জন, দুমকিতে এক হাজার ছয়শ ৭৭ জন এবং সদর উপজেলায় চার হাজার আটশ ২৭ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন  : লালমনিরহাটে শোবার ঘরে ব্যবসায়ীর মরদেহ
--------------------------------------------------------

জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানায়, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। তার পরেও পটুয়াখালীর উপকূলীয় নদ-নদী ও সাগরে ইলিশের আকাল চলছে। জ্যৈষ্ঠ থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও মধ্য শ্রাবণেও দেখা মিলছে না ইলিশের। শ্রাবণের জোয়ারে প্রতিবছর প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও এ বছর তাও মিলছে না। এর ফলে স্বল্প পুঁজির বিনিয়োগকারী পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৭০ হাজার জেলে হতাশ হয়ে পড়েছেন। অভাব-অনটনের মধ্যে মানবেতর জীবন-যাপন করছে এসব জেলে পরিবারগুলো। আড়ৎদার আর মহাজনদের দাদনের টাকা পরিশোধের চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে এসব জেলেদের। তারা বলছেন, ভরা ভরা মৌসুমে নদী থেকে ইলিশ গেলো কই? 

জেলার উপকূলীয় অঞ্চল আলীপুর, মহিপুর, চর মোন্তাজ, মৌডুবী, কোরালিয়া, চালিতাবুনিয়া, চর আন্ডা, চর কাজল, কলাগাছিয়া ও রাঙ্গাবালীসহ উপকূলের মৎস্য আড়ৎগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। সর্বত্রই ইলিশের জন্য চলছে হাহাকার। গভীর সমুদ্রেও জেলেদের জালে ধরা পরছে না রূপালি ইলিশ। জেলার বিভিন্ন এলাকার মৎস্য কেন্দ্রগুলো এখন ইলিশ শূন্য।

মাঝে মধ্যে কিছু ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পরলেও এর দাম আকাশচুম্বী। গত বছর এমন সময় প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশ মণ ইলিশ উঠতো প্রতিটি আড়তে। আর এ বছর ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা মিলছে না। প্রতিদিন ২০-২৫ মণ ইলিশও আসে না আড়ৎগুলোতে। এভাবে ইলিশের আকাল চললে জেলেরা তাদের দাদনের টাকাই শোধ করতে পারবে না।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজ মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আজাদ সাথী আরটিভি অনলাইনকে বলেন- ‘নদী ও সাগর কোথাও ইলিশ নেই। জেলেরা শূন্য হাতে তীরে ফিরে আসছেন। এতে জেলেদের মধ্যে হাহাকার চলছে। এসব জেলেরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এমনকি এসব জেলেদের যেসব ব্যবসায়ীরা বাকিতে খাওয়াতো, ইলিশ না পাওয়ায় ওইসব ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে।’

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আলীপুর-মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিমাই চন্দ্র দাস আরটিভি অনলাইনকে বলেন- ‘এ বছর ইলিশের অবস্থা খুবই খারাপ। কোথায়ও ইলিশ নেই। এখানকার ব্যবসায়ীদের এ মৌসুমে ৩০ কোটি টাকা লোকসান হয়ে গেছে। জেলেদের অবস্থা কী হতে পারে তাতো বুঝতেই পারছেন।’

তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন আরটিভি অনলাইনকেবিলেন- ‘ইলিশ গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে। যখন বেশি বৃষ্টি শুরু হয় তখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উপকূলের দিকে আসতে থাকে। আশা করি, এ বছরও অনেক ইলিশ পাওয়া যাবে। তবে এজন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। পরিপক্কতা না এলে উপকূলে তেমন ইলিশ আসে না এবং জেলেদের জালেও ধরা পরে না।’ 

আরও পড়ুন  : 

জেবি/পি