• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫

ফের দখল হচ্ছে ভৈরব নদের পাড়!

মাজেদুল হক মানিক, মেহেরপুর
|  ২১ জুলাই ২০১৮, ১৭:৪২ | আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৮, ১৮:০৩
দখলদারদের কবলে চলে যাচ্ছে মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদের জমি। গত বছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে নদটি খননের পর কিছুটা হলেও স্বরূপে ফিরেছে ভৈরব। দখলের ফলে সুবিধাবঞ্চিত হতে যাচ্ছেন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, দখল আর দূষণে একসময়ের প্রমত্তা ভৈরব মরা খালে পরিণত হয়। নদটি খননে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী। ২০১০ সালে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিবনগরের আম্রকাননে এলে এ দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভৈরব নদ খননের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশে ভৈরবের প্রবেশ দ্বার গাংনী উপজেলার কাথুলী থেকে মুজিবনগরের রতনপুর পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার খননের উদ্যোগ নেয় সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয় ৭০ কোটি ৬৫ লাখ ৫১ হাজার ২১৬ টাকা। ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল খনন কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল কাজ শেষ হলে স্বরূপে ফেরে ভৈরব নদ। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কার্স লিমিটেড ১৯২২ সালের রেকর্ড অনুযায়ী নদের সীমানা পর্যন্ত  খনন করে। এতে নদী পারের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ হয়। নদের যেকোনো জায়গায় দাঁড়ালেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়। নদের পাড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া অনুভব করতে প্রতিদিন বিকেলেই ভিড় পড়তে থাকে। খননের মধ্য দিয়ে এলাকার চাষিদের সেচ সুবিধা, দেশীয় মাছের উৎস সৃষ্টিসহ নানাবিধ সুবিধা ভোগ করছেন এলাকার হাজার হাজার মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রতনপুর থেকে কাথুলী পর্যন্ত নদের দুই পাড়ে অনেক বাড়ি-ঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছিল দখলদাররা।

খননকালে সেগুলো ভেঙে দিয়ে মাটি ভরাট করা হয়। কিন্তু খনন শেষে নদের পারের বাসিন্দারা তাদের নিজ নিজ জমির সীমানার নিচে আবারও নদের পার দখল করে নিচ্ছে। কেউ গাছ লাগিয়ে কেউ আবার বেড়া দিয়ে ঘিরে দখলে মেতে উঠেছেন। ফলে নদের পার দিয়ে জনসাধারণের চলাচলের সুযোগ নেই।

বাগোয়ান ইউপি চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, নদটি খননের পর যত্রতত্র মাটি ফেলে পার বাঁধা হয়েছে। কোনও প্রকার ড্রেজিং করা হয়নি। এতে নদের পারের মানুষের সুবিধার পরিবর্তে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। এতে তারা মাটি কেটে চলাচলের মতো পথ তৈরি করতে গিয়ে দখল করে নিয়েছেন। নদের দখল ঠেকাতে দুই পারে চলাচলের রাস্তা নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

কাথুলী ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান রানা আরটিভি অনলাইনকে বলেন, নদের পারে মাটি ভরাট করে অনেক উঁচু করা হয়েছে। এই উঁচু মাটি স্কেব্রেটার দিয়ে কেটে বিক্রি করছে বিভিন্ন মহলের মানুষ। গেল কয়েক মাস ধরে অব্যাহত মাটি বিক্রির ফলে নদের পার বিলীন হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য মাটি কাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কয়েকটি অভিযান হয়েছে। কিন্তু সুযোগ পেলেই অনেকে মাটি কেটে বিক্রি করছেন।

এদিকে ভৈরব নদ বয়ে গেছে মেহেরপুর শহরের পশ্চিম পাশ দিয়ে। পৌরসভার অংশে দৃষ্টিনন্দন করার জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছে মেহেরপুর পৌরসভা।

মেহেরপুর পৌর মেয়র মাহফুজুর রহমান রিটন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় জেলা প্রশাসককে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। অনুমতি পেলে দুই পারে চলাচলের জন্য পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হবে। শহরের ব্যস্ততা কাটিয়ে একটু স্বস্তির আশায় ভৈরব পারে চলাফেরা ও বসার ব্যবস্থা করা হবে। পরিবেশ রক্ষায় লাগানো হবে দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এগুলোর মধ্য দিয়ে অন্তত পৌরসভার এলাকার মধ্যে প্রায় চার কিলোমিটার নদ দখল ঠেকানো যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এদিকে নদী খনন ও আবারও দখলের বিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন নেতৃবৃন্দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে নদ দখল ঠেকাতে নানা প্রস্তাবনাও দিয়েছেন।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন মেহেরপুরের সুবাহ সংস্থার উপদেষ্টা রফিকুল আলম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে খনন করে তাদের ইচ্ছেমতো মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। ড্রেজিং এর মধ্য দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ তৈরি করা হয়নি। ফলে নদ পারে মানুষজন চলাফেরার সুযোগ নেই। এতে সহজেই দখলদাররা তাদের কার্য হাসিল করছে। দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা না নিলে আবারও আগের মতই দখলে চলে যাবে।

এ প্রসঙ্গে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ভৈরবে অবৈধভাবে মাটি কাটার অপরাধে বেশ কয়েকজনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে নদী পারের জায়গা জনসাধারণের সুবিধার্থে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, পদ্মার প্রধান শাখা নদী হিসেবে ভৈরব মেহেরপুরের কাথুলী দিয়ে প্রবেশ করে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা পর্যন্ত বিস্তৃত। নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। খুলনার ইছামতি ও যশোরের কপোতাক্ষ হচ্ছে ভৈরবের শাখা নদী। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৌগলিক পরিবেশে ভৈরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মেহেরপুর ছাড়াও যশোরে ভৈরব নদীর কিছু অংশ খনন হচ্ছে।

জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়