• ঢাকা বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫

খুঁটি নাই, লাইন নাই, সংযোগ নাই, তবু ৪২ জনের নামে ২ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল!

হাসান-উল-আজিজ, লালমনিরহাট
|  ১৪ জুলাই ২০১৮, ১৭:৩১ | আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৮, ১৭:৩৭
খুঁটি-লাইন-সংযোগ কিছুই নাই অথচ ৪২ পরিবারের নামে বিদ্যুতের বিল দুই লাখ ১৮ হাজার ৯৯৯ টাকা। এ ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। দ্রুত ভুয়া বিল বাতিল এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী ছোট্ট একটি গ্রামের নাম মহিষাশ্বহর। গ্রামটিতে অধিকাংশই হতদরিদ্র আর অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। উন্নয়নের ছোঁয়া একদম নেই বললেই চলে। এ গ্রামের ৪২টি পরিবার বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা বিদ্যুৎ অফিসে ২০১৫ সালে আবেদন করে। আবেদনের পরপরই এক শ্রেণির দালালচক্র তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার আশ্বাস দেয়। সহজ-সরল গ্রামবাসীর অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তিন মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কথা বলে দালালচক্রটি হাতিয়ে নেয় অন্তত ১০ লক্ষাধিক টাকা। এদিকে তিন বছর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ওই এলাকায় বসেনি কোনও বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা মিটার। এমনকি নকশাও তৈরি হয়নি। ফলে বিদ্যুতবিহীন রয়েছে ওই গ্রামটি।

শনিবার সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা আক্ষেপের সুরে জানান, আদিতমারী উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের মহিষাশ্বহর গ্রামের বিদ্যুতহীন ৪২ গ্রাহকের বিদ্যুতের সংযোগের জন্য বিগত তিন বছর দুই মাস আগে আবেদন করা হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কালীগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে। আবেদনের পর বিদ্যুতের স্থানীয় চিহ্নিত একটি চক্র প্রতি গ্রাহকের কাছ থেকে মিটার প্রতি ১২-১৮ হাজার টাকা বুঝে নেন এবং তিন মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার আশ্বাস প্রদান করেন। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও মিলেনি বিদ্যুতের খুঁটি, লাইন কিংবা মিটার। এরইমধ্যে সরকার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বেসরকারি খাতে নেয়ার পরিকল্পনা হাতে নেয়। নিয়ম অনুযায়ী পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় তাদের নতুন সংযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। এতেই বিপাকে পড়েন বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা ও দালাল চক্রটি।

এদিকে গ্রাহকদের চাপের মুখে গত বছর ওই গ্রামের ৪২টি পরিবারের জন্য ৪২টি মিটার পাঠানো হয়। খুঁটি কিংবা লাইন না পেয়ে গ্রাহকরা মিটারগুলো বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরইমধ্যে গত জুন মাসে ওই গ্রামের ৪২টি পরিবারের নামে জনপ্রতি ৫ হাজার ৯৩ টাকা হারে দুই লাখ ১৮ হাজার ৯৯৯ টাকার বিদ্যুৎ বিল পাঠায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নেসকো।

বিদ্যুৎ বিল দেখে হতবাক পরিবারগুলো বিলের কাগজপত্র নিয়ে কালীগঞ্জ বিদ্যুৎ অফিস গিয়ে এর সমাধান দাবি করলেও কোনও প্রতিকার না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। এরপর তারা ভুয়া বিল বাতিল করে দ্রুত লাইন সংযোগ করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। 

ওই গ্রামের মফিজুর রহমান বাদশা, মন্তাজ উদ্দিন, ইব্রাহিম খলির জানান, তিন মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কথা বলে দালালচক্র জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা নেন। বিদ্যুতের আশায় কেউ কেউ স্থানীয় মহাজনের কাছে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালালচক্রকে টাকা দেন। কিন্তু আশ্বাস আর সময় ক্ষেপণ করে অতিবাহিত হয় দীর্ঘ সময়। উপরন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না পেলেও ৫ হাজার ৯৩ টাকার বিদ্যুৎ বিল চলে আসে তাদের প্রতিটি গ্রাহকের নামে।

মহিষাশ্বহর গ্রামের রেজাউল হক ও কফিল উদ্দিন জানান, আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও আমাদেরকে বিদ্যুতের ভুয়া বিল দেয়া হয়েছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ ও এরসঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তারা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কালীগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ের প্রকৌশলী শাহানুর ইসলাম আরটিভি অনলাইনকে জানান, ইতোমধ্যেই এসব গ্রাহকের বিল মওকুফ করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।  

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান আরটিভি অনলাইনকে জানান, সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।

জেবি/পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়