• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

নিজের ফ্ল্যাট বিক্রি করে স্কুল নির্মাণ

জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ
|  ১৭ জুন ২০১৮, ১৩:৪৩ | আপডেট : ১৭ জুন ২০১৮, ১৪:২১
রাজধানীর বারিধারার ডিফেন্স অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি’র ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা দিয়ে দুর্গম চরাঞ্চলে নিজ জন্মভূমিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন চৌধুরী। 

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ৬৭ শতাংশ জমির ওপর তিনি ২০১২ সালে এই বিদ্যালয়টি স্থাপন করেছেন। দাদার নামে বিদ্যালয়টি নাম দিয়েছেন কুটি মিয়া স্মৃতি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি সাত বছর ধরে চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে, পদ্মা নদীর ওপারে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের গঙ্গাধরদি চরে বিদ্যালয়টির অবস্থান। বিদ্যালয়ের আঙিনাজুড়ে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু এবং পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। 
চারদিকে বিভিন্ন কাঠগাছবিশিষ্ট ছায়াশীতল বিদ্যালয়টিতে আছে চারটি চারচালা টিনের ঘর। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য ৬টি শ্রেণি কক্ষ, ১টি শিক্ষকদের কক্ষ, ১টি স্টোর কক্ষ এবং ১টি বিশ্রাম কক্ষ। আছে একটি ছোট খেলার মাঠও। 

৭৭ বছর বয়সী আশরাফ হোসেন চৌধুরী এলাকায় রবিন মিয়া নামে বেশি পরিচিত। তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, প্রাথমিক শিক্ষাই শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষার মূল ভীত তৈরি করে। তবে এই চরে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিশুরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। দু-একজন শিশু পড়ালেখা করলেও অনেক দূরের স্কুলে যেতে হতো। এই বিষয়টি তাকে দারুণভাবে নাড়া দেয় এবং এ কারণেই তিনি সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। 

তিনি বলেন, ১৯৬৬ সালে তিনি অডিটর হিসেবে মিলিটারি একাউন্টস-এ চাকরিতে যোগ দেন। অডিটর অ্যাকাউন্টস-এ বিসিএস-এর মাধ্যমে ১৯৯২ সালে তিনি ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টে ডেপুটি কন্ট্রোলার হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০১ সালে তিনি কন্ট্রোলার হিসেবে পদোন্নতি পান এবং ২০০৩ সালে তিনি অবসরে আসেন। 

ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টে চাকরির সুবাদে রাজধানী ঢাকা সেনানিবাস বারিধারা এলাকায় ডিফেন্স অফিসার্স হাউজিং সোসাইটিতে আশরাফ চৌধুরী এবং তার আরেক সহকর্মী ৫টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান। আশরাফ চৌধুরী তার ছেলে ও মেয়েকে একটি করে ফ্ল্যাট দেন। আর বাকি অর্ধেক ফ্ল্যাট ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। এর থেকে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে তিনি বিদ্যালয়ের ঘর তৈরি করেন। আর বাকি টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেন। পাঁচজন শিক্ষকের বেতন-ভাতা এবং বিদ্যালয়ের আনুষঙ্গিক সকল ব্যয়ভার তিনি বহন করছেন তার সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ থেকে। তিনি বলেন, এখন আমার বয়স হয়ে গেছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।

আশরাফ হোসেন চৌধুরী তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা  ফাতেমা আক্তারকে নিয়ে এখন বসবাস করেন ঢাকার বকশীবাজারে নানার বাড়িতে। আশরাফ চৌধুরীর স্ত্রী ফাতেমা কানিজ বলেন, আমরা দু’জনই অবসরপ্রাপ্ত। কোনো রকমে চলছি। আমরা খুব একটা সচ্ছল নই। কাজেই আমাদের দুইজনের যেকোনো একজনের অনুপস্থিতিতে স্কুল চলা কষ্টকর। তাই স্কুলটি সরকারি হওয়া জরুরি। 

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসহ এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, বিদ্যালয়টি হওয়ায় তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ হয়েছে। তবে উপবৃত্তির টাকা পেলে তাদের জন্য সুবিধা হতো।

প্রধান শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, বিদ্যালয়ে বর্তমানে ২৩৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রাথমিক সমাপণী পরীক্ষায় শতভাগ পাসের পাশাপাশি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবারই ভালো ফলাফল করছে। সরকারিকরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির অর্থ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের সরকারি বই দেয়া হয়।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এবং বিচারপতি নূরুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজের সহকারি অধ্যাপক আহম্মদ হোসেন বলেন, প্রতি মাসে শিক্ষকদের বেতন বাবদ ২৫ হাজার টাকা ছাড়াও আনুষঙ্গিক আরও ব্যয় রয়েছে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়টির ব্যয়ভার চালানো প্রতিষ্ঠাতা আশরাফ হোসেনের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। 

স্থানীয় লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ হোসেন ইমাম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, এই চরের আশপাশের চার বর্গ কিলোমিটারের এলাকার মধ্যে এটিই একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশরাফ হোসেন চৌধুরীর এই মহতী উদ্যোগের কারণে এই চরের শিশুদের পড়ালেখার সুযোগ হয়েছে। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলেয়া ফেরদৌসী শিখা আরটিভি অনলাইনকে বলেন, সারাদেশে এক হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদন হওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের প্রস্তাব পাঠানো হবে।

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়