• ঢাকা রোববার, ২৪ জুন ২০১৮, ১০ আষাঢ় ১৪২৫

খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র এখন মরা খাল

সুজিত রায়, জামালপুর
|  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:৫৬ | আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:০২
জামালপুরের এক সময়ের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদ নাব্য হারিয়ে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদটি খনন না করায় পলিমাটি জমে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদের বুকে স্রোতের কলকল ধ্বনি, ছোট-বড় পাল তোলা ডিঙ্গি নৌকার যাতায়াত, আর শিকারিদের দিনরাত মৎস্য শিকার এখন আর নেই।

একসময় এ নদ দিয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর হয়ে হাজার মণের নৌকা পাটসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে যাতায়াত করতো। সে সময় দেশি-বিদেশি বণিকরা ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে পাল তোলা নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমারে যাতায়াত করতো।

কালের বিবর্তনে সেই ব্রহ্মপুত্র নদ এখন স্রোতহীন মরা গাঙ। বর্ষার মৌসুম শেষ হতে না হতেই নদের বুকে জেগে উঠছে অসংখ্য চর।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিব্বতের কৈলাস পর্বতের হিম শীতল জলপ্রপাত, মানস সরোবরের নীলপদ্ম বিধৌত জলরাশি ও চেমাইয়াং ডং হিমবাহের স্রোতে প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদের সৃষ্টি।

ব্রহ্মপুত্র নদটি আসামের ধুবড়ি থেকে নেমে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী হয়ে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের খোলাবাড়ি এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে ইসলামপুর, মেলান্দহ এবং জামালপুর শহরের কূল ঘেঁষে সদর উপজেলার বুক চিড়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

বর্তমানে ব্রহ্মপুত্রের জেগে ওঠা চরে আলু, বেগুন, টমেটো, বোরো ধানের চাষসহ গরু-ছাগলের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। জামালপুরে কোথাও উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই ব্রহ্মপুত্র নদটি দিনের পর দিন মাটি ভরাট হয়ে দেশের মানচিত্র থেকে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে।

একসময় দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘ এই নদকে ঘিরে প্রকৃতি এঁকেছিল জলরং সবুজের প্রতিচ্ছবি। সেই উত্তাল নদকে ঘিরে প্রাচীন আমলে বিভিন্ন স্থানে নৌ-বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। যুদ্ধবিগ্রহের জন্য সৈন্য ও গোলাবারুদ এই নৌপথেই আনা-নেয়া হতো

। কিন্তু কালের বিবর্তনে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ কৃষি আবাদে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। নদের তলদেশে পানি না থাকায় সেচনির্ভর কৃষকরা পড়েছেন মহাসংকটে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শত বছরেও কোনো ড্রেজিং না হওয়ায় নদের তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্যসহ মৎস্য সম্পদ ও নানা জলজ প্রাণী। হাজারও জেলে পরিবার তাদের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্রহ্মপুত্র নদ জরুরিভিত্তিতে ড্রেজিং করে এর নাব্য ফিরিয়ে আনা জামালপুরের প্রায় ২৬ লাখ মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

নৌকার মাঝি হাসেম আলী আরটিভি অনলাইনকে জানান, নদী শুকনো। পায়ে হেঁটে মানুষ পাড়ি দেয়। নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তাই খুবই কষ্টে দিনযাপন করছি।

এদিকে ব্রহ্মপুত্রের গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সামান্য পানিতেই ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। সেইসঙ্গে গাছপালা ও কৃষি উৎপাদনে বিশাল প্রভাব পড়েছে। শুধু তাই নয়, ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্য সংকটে জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল হুমকির মুখে পড়েছে।

গেলো ২৩ ফেব্রুয়ারি জামালপুরের কালিঘাট ও থানার ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একসময়ের উত্তাল ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের বৈরিতার কারণে মৃতপ্রায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আগের মতো আর মাছ নেই নদীতে। মাছ না থাকার কারণে জেলে পরিবারগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে।

এছাড়া চাষাবাদে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কারণে পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। যে কারণে পরিবেশের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। যে কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে জেলার কয়েক লাখ মানুষ।

জেলার জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির নেতা জাহাঙ্গীর সেলিম আরটিভি অনলাইনকে জানান, শুকনো মৌসুমে নদে চর পড়লেও বর্ষাকালে সামান্য পানিতেই প্রবল বন্যা ও নদী ভাঙন দেখা দেয়। তাই জেলাবাসীর প্রাণের দাবি দ্রুত খননের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্য ফিরিয়ে আনা হোক।

এ বিষয়ে জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নবকুমার চৌধুরী আরটিভি অনলাইনকে জানান, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসস্থল থেকে নরসিংদী পর্যন্ত ড্রেজিং করার একটি প্রস্তাবনা বিআইডব্লিওটিএ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। অনুমোদন পেলে ড্রেজিং কাজ শুরু হবে।

আরও পড়ুন:

জেবি/পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়