• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৮ | ০৬ বৈশাখ ১৪২৫

শরীয়তপুরে খাল দখলের মহোৎসব

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
|  ০৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১৯:২০ | আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১৯:২৩
শরীয়তপুর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান প্রধান খালগুলো দখলের মহোৎসব চলছে। প্রভাবশালীরা বড় বড় ইমারত নির্মাণ করে খাল দখলের কারণে শহরের পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শহরবাসীর দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।

পৌর কর্তৃপক্ষ বলছেন, খালগুলো তাদের নয়। এ খাল ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত ও জেলা পরিষদের আওতায়। এ কারণে তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। তবে খাল উদ্ধারে পৌর কর্তৃপক্ষ প্রশাসনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

পৌরসভার নাগরিক আলী আজম মাদবর, আ. কুদ্দুছ মোড়ল জানান, শরীয়তপুর জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান প্রধান খালগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভরাট করে দখল করে নিয়ে বড় বড় ইমারত নির্মাণ করে বসবাস করছে। খাল ভরাট করে খালের ওপর দোকানপাট নির্মাণ করে হরদম ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। বিশেষ করে শরীয়তপুর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকবাংলা থেকে পৌর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত খাল, পালং থানার পেছনে রাজগঞ্জ ব্রিজ থেকে কীর্তিনাশা নদী পর্যন্ত খাল, কোর্ট চত্বর থেকে মনোহর বাজার হয়ে কীর্তিনাশা নদী পর্যন্ত খাল, ডাকবাংলা থেকে পাকার মাথা পর্যন্ত পুরো খাল দখল করে পাকা, আধাপাকা ইমারত নির্মাণ করে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকার জমি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে সরকারদলীয় ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিরা।

তাদের কেউ ভয়ে কোনো প্রতিবাদ করতে পারছে না। এ সকল খাল ভরাট করে ৫তলা, ৬তলা পাকা ইমারত নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে সুপার মার্কেট, বিপণিবিতান, বাড়িঘর ও দোকানপাট করে নিজে অথবা ভাড়াটিয়া দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করছেন।

এ সকল প্রভাবশালীদের খাল দখলের কারণে শহরের পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায় আবাসিক এলাকাগুলো।

পৌর এলাকার ৩নং ওয়ার্ডের বিশাল একটি অংশ যাতে একসময় ধান, পাট, সরিষা, কলাই, মটর ও ইরি-বোরো ধান উৎপন্ন হতো। বিশাল এলাকাজুড়ে সেই মাঠ আজ পানিতে তলিয়ে থাকায় ঐ এলাকার মানুষ বারো মাসই নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারছে না।

বিশেষ করে হাঁটু পানির নিচে তলিয়ে থাকার কারণে ৫-৬ বছর ধরে ওই সকল জমিতে তারা কোনো ফসল ফলাতেও পারছে না। এ সকল মাঠে এখন পানি আর কচুরিপানায় ভরা।

রাজগঞ্জ ব্রিজ থেকে কীর্তিনাশা নদী পর্যন্ত খাল। এ খালে ৫ বছর পূর্বেও নৌযান চলাচল করতো।

নৌযানে করে শহরের ব্যবসায়ীরা কম খরচে মালামাল পরিবহন করতেন। স্থানীয় প্রভাবশালীরা খালের মধ্যে কলাম করে পাকা ঘর তৈরি করে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। পৌর মেয়র, জেলা প্রশাসক বিষয়টি জেনেশুনেও উচ্ছেদের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।

এদিকে ডাকবাংলা থেকে পৌর বাসস্ট্যান্ড হয়ে কোটপাড়া নদী পর্যন্ত খাল। এ খালের ওপর গড়ে তুলেছে বিশাল বিশাল বাড়িঘর ও দোকানপাট। বিপণিবিতান, সুপার মার্কেট করে নিজের আওতায় নিয়ে সরকারি জমি দখলদাররা দাবি করছে ব্যক্তি মালিকানা জমি হিসেবে।

এখন খালের কোনো চিহ্নও নেই। পানি বা পয়ঃনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় শহরের মলমূত্র ও বাসাবাড়ির ব্যবহৃত ময়লা আবর্জনার পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। যে যার মতো করে দখল করে রেখেছে সরকারি এসব খাল।

পাশাপাশি কোর্ট চত্বর এলাকা থেকে মনোহরবাজার হয়ে কীর্তিনাশা নদী পর্যন্ত প্রবাহমান খাল দখলদারদের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব খাল দখল করে নিলেও প্রশাসন কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে প্রবহমান খালগুলোকে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে অবমুক্ত করে নাগরিক সুবিধার জন্য উদ্যোগ নিতে দাবি করেছেন পৌরবাসী।

পৌরসভার নাগরিক আ. কুদ্দুছ মোড়ল বলেন, প্রভাবশালীরা খাল দখল করার কারণে শরীয়তপুর পৌরবাসী বারমাসই পানিতে ডুবে থাকে। জরুরি ভিত্তিতে খাল অবমুক্ত করা দরকার।

বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলী আজম মাদবর বলেন, শরীয়তপুর শহরের প্রধান খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি সরে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। শহরে বার মাস পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে করে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও পালং বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আ. সালাম বেপারী বলেন, প্রভাবশালীরা খাল ভরাট করে ইমারত নির্মাণ করেছে। এতে বাজারের মালামাল পরিবহন করা কষ্ট হচ্ছে। আর আমরা যে দোকানপাট করেছি সেটা আমাদের রেকর্ডিয় মালিকানার জমি। এটা সরকারি খাল নয়।

শরীয়তপুর সুশীল সমাজের প্রতিনিধি সাবেক পৌর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ কোতোয়াল বলেন, শরীয়তপুর পৌর এলাকার প্রবহমান খালগুলো ভরাট করে এক শ্রেণির প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। সেখানে বড় বড় ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে শহর হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়।

শরীয়তপুর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল বলেন, খালগুলো পৌরসভার নয়। এ খাল ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত ও জেলা পরিষদের আওতায়। এ কারণে তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, শরীয়তপুরে যে সকল খাল অবৈধ দখল হয়েছে তা এরইমধ্যে কিছু উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারের জন্য প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার বলেন, শরীয়তপুর জেলায় জেলা পরিষদের যে সকল জমিজমা রয়েছে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে খোঁজখবর নিয়ে সকল জমি উদ্ধারের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের বলছি সরকারি সম্পত্তি সরকারকে ছেড়ে দিতে। অন্যথায় অচিরেই উদ্ধারের অভিযান শুরু করব।

জেবি/পি

আরও পড়ুন-

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়