close
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

ইছামতি নদীতে বাঁধ, ভোগান্তিতে কয়েক লাখ মানুষ

জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস
|  ২৭ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:০১ | আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:০৮
বাঁধ দেয়ার কারণে মানিকগঞ্জের ইছামতি নদী পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গাসহ অন্যান্য নদী ও খাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে জেলার হরিরামপুর, শিবালয় ও ঘিওরসহ অন্যান্য উপজেলার বাসিন্দারা নৌ যোগাযোগসহ অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, জেলে, মাঝিসহ সবস্তরের মানুষ বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েছে।

গেলো বছর বর্ষা মৌসুমের আগে হরিরামপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর বাজার এলাকায় পদ্মার সঙ্গে ইছামতি নদীর মিলনস্থলে এই বাঁধ তৈরি করা হয়।

ইছামতি নদীটি জেলার হরিরামপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর বাজার এলাকায় পদ্মার সঙ্গে শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ এলাকায় যমুনা নদীর সঙ্গে, ঘিওর উপজেলার মাইলাগি এলাকায় ধলেশ্বরী নদী এবং তরা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ আরটিভি অনলাইনকে জানান, বাহাদুরপুর বাজার এলাকার পদ্মা নদীর মিলনস্থল থেকে জাফরগঞ্জ এলাকার যমুনা নদীর মিলনস্থল পর্যন্ত ইছামতির দৈর্ঘ্য ৩৬ কিলোমিটার। বিভিন্ন এলাকায় অন্যান্য নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত এই নদীটির দৈর্ঘ্যও প্রায় একই রকম। শুধু তাই নয়, এই জেলার অভ্যন্তরীণ আরো ছোট ছোট ছয়টি নদী এবং অসংখ্য খালের সঙ্গে এই নদীর সংযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বাহাদুরপুর, রামকৃষ্ণপুর, কপালীপাড়া এবং আশপাশের এলাকার কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝি, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আইনজীবী এবং জনপ্রতিনিধিসহ সবস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতে বাঁধ দেয়ায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অন্যান্য নদী থেকে এই নদীতে মাছ আসতে পারছে না। এ কারণে এই এলাকার জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

পাল তোলা ছোট নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার আয়ে যাদের জীবিকা চলত তারাও মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

রামকৃষ্ণপুর গ্রামের নৌকার মাঝি হায়াত আলী মোল্লা আরটিভি অনলাইনকে জানান, তারা বংশ পরম্পরায় বাহাদুরপুর ঘাট এলাকায় নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইছামতি নদীতে বাঁধ দেয়ায় নৌ যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ফলে তাদের আয় কমে গেছে। তারা এখন কিভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলবেন তা নিয়ে চিন্তিত।

রফিক মোল্লা (৬৫) নামের এক বৃদ্ধ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, তিনি ইছামতি নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু গেলো বছর বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পদ্মা, যমুনা কিংবা অন্য নদীগুলো থেকে মাছ আসতে পারছে না। নদীতে মাছ না থাকায় তারা খুবই কষ্টে আছেন। তিনি এই বাঁধ অপসারণ করে নদীপথকে সচল রাখার দাবি করেন।

গোপীনাথপুর ভাটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, নদীতে বাঁধ দিয়ে নৌ যোগাযোগ বন্ধ করা ঠিক হয়নি। জনসাধারণের সুবিধার জন্য অবিলম্বে এই বাঁধটি ভেঙে ফেলা উচিত। সেইসঙ্গে নদী খনন কাজ দ্রুত শেষ করারও দাবি করেন তিনি। 

ঝিটকা বাজারের ব্যবসায়ী গোলাম ছরোয়ার খান লোদী আরটিভি অনলাইকে বলেন, জেলার বড় কয়েকটি বাজারের মধ্যে ঝিটকা বাজার অন্যতম। এই বাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক ইছামতি নদীপথে বিভিন্ন পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য নিয়ে আসত। কিন্তু গেলো বছর নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে বাজারে পণ্যের আমদানি কমে গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব ব্যবসায়ী এই বাজারে আসত তারা আর এখন আসছেন না। হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের পাঁচটি ইউনিয়নের লোকজন নদীপথে এই বাজারে আসতে পারছেন না। ফলে বাজারের বেচাকেনা কমে গেছে। তিনিও বাঁধটি দ্রুত ভেঙে ফেলার দাবি জানান।

গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস আরটিভি অনলাইনকে বলেন, নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করা ঠিক হয়নি। ওই বাঁধ নদীভাঙন রোধ করবে এমন কথারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং বাঁধ নির্মাণের ফলে হরিরামপুর উপজেলার পাঁচটি চরাঞ্চলের লোকজন তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবোর জন্য ঝিটকা হাটে নৌকা নিয়ে আসতে পারছে না। এতে করে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জেলে, মাঝি ও জনসাধারণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাঁধের কারণে গোপীনাথপুর, চরপাড়া, কপালীপাড়া, মধ্যপাড়া, ভাটিপাড়া, ডেগির এলাকার প্রতিটি চকে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে গেলো বছর চৈতালির আবাদ সময়মত করতে পারেননি কৃষকেরা। তারা নিজ খরচে পানি অপসারণ করে সেখানে চাষাবাদ করে। এছাড়া নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছের চাষ করায় সেখানকার পানি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সেখানে মশা ও কচুরিপানা বংশ বিস্তার করছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ নদীতে বাঁধ তৈরি করে জলাশয়ে মাছের চাষ করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু লোক। তারা নিজেদেরকে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী বলে দাবি করেন। গেলো বছর জেলেদের পাশাপাশি এলাকাবাসী ওই জলাশয়ে মাছ ধরতে গেলে সরকার দলীয় লোকজন বাধা দেয়। তাদের বাধা উপেক্ষা করে এলাকাবাসী মাছ ধরতে গেলে পুলিশ এসে মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়। ফলে এলাকার জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার সচেতন মহল মনে করছে বাঁধটি দ্রুত অপসারণ না করলে যেকোনো সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। 

হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল বাশার সবুজ  আরটিভি অনলাইনকে বলেন, নাব্যতা রক্ষার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ইছামতি নদী খননের কাজ চলছে। গেলো বছরের বর্ষা মৌসুমে এই খনন কাজ শুরু হওয়ার সময় বাহাদুরপুর বাজার ও তিন কিলোমিটার উত্তরে কপালীপাড়া এলাকায় ইছামতি নদীতে বাঁধ দেয়া হয়। খননকাজ শেষ হলে এই বাঁধ অপসারণ করার কথা। কিন্তু পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে বাহাদুরপুর, রামকৃষ্ণপুর এলাকা রক্ষার্থে ওই এলাকার লোকজন ব্যক্তি উদ্যোগে বাঁধটি আরো উঁচু করেছে। এখন তা সড়ক হিসেবে ব্যবহার করছে।

এছাড়া ঝিটকা এলাকায় সেতু নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় সেখানেও নদী পার হওয়ার জন্য একটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এই সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে নদীর সকল বাঁধ অপসারণ করে পানি প্রবাহ ঠিক রাখা হবে।

তবে নদীতে বাঁধ তৈরি করে মাছ চাষের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মহীউদ্দীন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, তিনি বাঁধটি ভাঙার জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু বাঁধটি না ভাঙার পক্ষে অনেক লোক থাকায় সেটি ভাঙা সম্ভব হয়নি।

নদীতে বাঁধ দেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী রেজোয়ান আরেফিন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, গেলো উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে বাঁধটি ভেঙে ফেলা হবে।

জেবি/জেএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়