close
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ | ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

বান্দরবানে বহিষ্কৃতরাই আ.লীগ-বিএনপির মাথাব্যথা

শাফায়েত হোসেন
|  ১৬ অক্টোবর ২০১৭, ২১:২৫ | আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৭, ১১:৫৬
বান্দরবানে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারাই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহিষ্কৃত নেতাদের নিয়ে তুষের আগুনের মতো জ্বলছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। আর সাচিংপ্রু জেরী বনাম ম্যাম্যচিং দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পুড়ছে বিএনপি। তবে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বহুবার চেষ্টা করেও অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটাতে পারেনি। আওয়ামী লীগে প্রকাশ্য কোনো ধরনের বিরোধ দেখা না গেলেও সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রয়েছে বলে জানা যায়। 

দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটাতে ব্যর্থ হলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলেই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিং বান্দরবান আসনে গেলো পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিজয়ী হয়েছেন। এ কারণে আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এবার এ আসনে দলীয় মনোনয়নে বীর বাহাদুর উশৈসিং এর প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন দলের সাবেক জেলা সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা এবং জেলা কমিটির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবর রহমান।


গেলো নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি জানান, জনগণসহ তৃণমূল কর্মীদের বাদ দিয়ে সিনিয়র নেতাদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত উন্নয়নের চিন্তায় ব্যস্ত ছিলেন বলে তিনি তাদের ওপর বিরক্ত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। তাছাড়া ওই সময়ে বিএনপির অনুপস্থিতিতে দলের যে কারোরই নির্বাচন করার বিষয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত ছিল। তারপরও এ নিয়ে নেতাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। 

তবে তিনি মনে করেন, অভ্যন্তরীণ বিবাদ নিরসন ও নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থা আনতে না পারলে দলীয় প্রার্থীর বিজয় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাধ্য করলে তিনি আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবেন। এ ব্যাপারে দলের অনেকেই তার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। 

জেলা কমিটির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবর রহমান বলেন, নিজেদের আখের গোছাতে ব্যর্থ হয়ে কয়েক নেতা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। এই নেতাদের সঙ্গে কর্মীদের সম্পর্ক নেই। তারা কর্মীদের দুঃখ বোঝেন না। তার অভিযোগ, পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং পার্বত্য এলাকায় অনেক উন্নয়ন করেছে এবং উন্নয়ন কাজ চলমান রেখেছে ঠিকই, কিন্তু সে উন্নয়নের টেন্ডার কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করছেন জেলা-উপজেলার কয়েক সিনিয়র নেতা। 

তিনি আরো বলেন, কয়েক সিনিয়র নেতা নিজেদের উন্নয়নের জন্য তাকে ঘিরে রেখেছেন। তবে সেসব নেতাদের ওপর কারো আস্থা নেই। এমন অবস্থায় জনগণসহ অন্য নেতাকর্মীরা বীর বাহাদুর উশৈসিংকে ভোট দেবে কি-না তা নিয়ে সংশয় আছে। এ কারণেই আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। 

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইসলাম বেবী কাজী মুজিবর রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, দলে গৃহবিবাদ থাকলেও সেটা কেটে গেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা এখন আগের চাইতে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। 

জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক ক্যসাপ্রু বলেন, সাম্প্রদায়িকতা, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে কাজী মুজিবর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন তিনিই উল্টো অভিযোগ করছেন। আসলে বীর বাহাদুর উশৈসিং দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন এবং দলকে আরো সংগঠিত করেছেন। তিনি দলীয় মনোনয়নের প্রধান দাবিদার। দলের মনোনয়ন পেলে তিনিই বিজয়ী হবেন।

পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনসমূহের মধ্যে কোনো প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই, কেবল এক ধারাতেই চলে আসছে সকল কার্যক্রম।

তিনি বলেন, জেলায় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনসমূহের মধ্যে কখনো কোনো দলীয় কোন্দল ছিল না, নেই এবং আগামীতেও থাকবে না। বান্দরবান তথা রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলায় সর্বক্ষেত্রেই জনকল্যাণে হাজারো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের বিশেষ নজর থাকায় বরাবরই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আসছেন সকলস্তরের মানুষ। পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নকামী জনগণই আগামীতে আবারও নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোট প্রদান করে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীকে জয়যুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 
 

অপরদিকে বান্দরবান জেলা বিএনপির অবস্থা আরো প্রকট। আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপিতে গৃহদাহ বেশি। সিনিয়র নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। কেন্দ্রীয় নেতারা দফায় দফায় চেষ্টা করেও তাদের মধ্যে কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। 

জেলা বিএনপির সভাপতি মা ম্যা সিং এবং সাবেক সভাপতি সাচিং প্রু জেরী দুই জনই ঐতিহ্যবাহী বোমাং রাজপরিবারের সদস্য। তাদের ঘিরে নেতাকর্মীরাও বিভক্ত। গেলো কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে রাজপরিবারের এ দুই সদস্য পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।

এবারও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ম্যাম্যচিং এবং সাচিং প্রু জেরী। ম্যাম্যচিং জানিয়েছেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের আগ্রহের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। 
সাচিং প্রু জেরী বলেছেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমর্থন তার পক্ষেই রয়েছে। আর নেতাকর্মীদের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন।


সমতলের চেয়ে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নির্বাচনী অংকও ভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএস) সমর্থন এ আসনের নির্বাচনে প্রভাব ফেলে। এ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনেকেই ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রার্থী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের বিজয়ের পর দলের নেতাদের সঙ্গে পিসিজেএস নেতাদের বিরোধ বাড়ে। 

পিসিজেএস আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে সমর্থন নাও দিতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এ অবস্থায় বান্দরবান জেলা পিসিজেএসের সাবেক সভাপতি কেএস মং জানিয়েছেন, সংসদ নির্বাচন বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে আগামী নির্বাচনে পিসিজেএস অংশগ্রহণ করবে। আর কে মনোনয়ন পাবেন, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।

ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) জেলা আহ্বায়ক ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা আরটিভি অনলাইনকে বলেছেন, নির্বাচন বিষয়ে কেন্দ্র থেকে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে তার নির্বাচনের পস্তুতি রয়েছে।

জেবি/এসএস 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়