• ঢাকা রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

`মিলিটারিরা দুধের বাচ্চাকেও পায়ের তলায় পিষে মেরে ফেলে’

মুহাম্মদ শাহীনুজ্জামান
|  ০৮ অক্টোবর ২০১৭, ২৩:৫৩ | আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০১৭, ১১:২৫
‘দুধের বাচ্চারাও মিলিটারিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। তাদেরকেও মিলিটারিরা পায়ের তলায় পিষে হত্যা করেছে। আমাদের প্রতিবেশী দুটি শিশু। একজনের নাম নূর হাকিম (৩ মাস) আর একজনের নাম নূর হাফেজ (৪ মাস)।  মিলিটারি ঢোকার পর বাড়িতে বড় কাউকে না পেয়ে বাচ্চা দুটোকে পায়ের তলায় পিষে মেরে ফেলেছে।’

মিয়ানমার আর্মির এই নির্মম অত্যাচারের কথা আরটিভি অনলাইনকে জানায় মংডুর কাউয়ার বিলের হাওলারুয়া  থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা কিশোর নূর হাসান (১৪)।

উখিয়ার বালুখালি শরণার্থী ক্যাম্পের একটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।

এ কিশোর আরো বলে, ‘আমার পরিবারের নয় জনকে মেরে ফেলেছে। এরমধ্যে আটজনকেই মিলিটারিরা জবাই করেছে। আমার মা বেশি ব্যথা পেয়েছে। আমার বাবা আবু কালাম,  চাচা হাফেজ তাহের, শাহ আলম এদের সবাইকে জবাই করে মেরে ফেলেছে।’  

যেদিন মিলিটারি এসেছে সেদিন ছিল শুক্রবার। বাড়ি,  মসজিদ সব ভেঙে ফেলেছে। যুবতি মেয়েদের ধর্ষণ করেছে। সোনা, রূপা, টাকা-পয়সা সব নিয়ে গেছে।

ওরা গাড়ি থেকে নেমে বৃষ্টির মত গুলি করেছে। পুরুষরা পালিয়ে যাওয়ার পর মেয়েগুলোকে ধর্ষণ করেছে। আর যে ১৩ জনকে ধরে ফেলেছিল তাদের সবাইকে জবাই করেছে। আমাদের পাশে যে বড় খাল ছিল সেখানে যুবতি ১০ থেকে ১৫ জন মেয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল। তাদের সবাইকে পানির মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলেছে।

নূর হাসান জানায়, আমাকেও তখন গুলি করেছিল। তবে আমি ডুব দিয়ে খালের ওপারে চলে যাওয়ায় বেঁচে গেছি।

নুর হাসানের পরিবার মোটামোটি অবস্থাসম্পন্নই ছিল। সে জানায়, আমাদের গরু ছিল ৮টি, ছাগল ছিল ৭টি, চাল ছিল ৪০০ কেজি। আমরা মানুষকে হালের গরু চাষের জন্য দিতাম। আমাদের অন্য কাজের দরকার ছিল না। অথচ এখন আমি ঠিকমতো খেতে পাচ্ছি না। যে কষ্ট পেয়েছি তাতে আর বার্মায় ফিরে যেতে চাই না।

নূর হাসানসহ অসংখ্য রোহিঙ্গার এই নির্মম বর্ণনা সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামের কথা হয় আরটিভি অনলাইনের। তিনি বলেন, নূর হাসানরা যা বলছে মিয়ানমারে আসলে তাই ঘটছে। কয়েকদিন আগে আমি উখিয়ায় রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিজে সরজমিনে দেখতে যাই। সেখানে এক রোহিঙ্গা কিশোর আমার গাড়ি থামিয়ে দেখিয়েছে মাইনের আঘাতে তার পা দুটো কিভাবে ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলছেন, রাখাইনে যা করছে তা স্পষ্টত মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধ। ফলে সেখানে জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের ১৫ পৃষ্ঠাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অঞ্চলে আইএস এর উত্থান হওয়ার যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সেটিরও যুক্তি সঙ্গত কারণ রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বারুদ যেমন জ্বালানোর জন্য তৈরি থাকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন পীড়ন এবং নৃশংসতার কারণে এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের ঝুঁকি ঠিক সেই পর্যায়ে রয়েছে। তবে অবশ্যই রোহিঙ্গারা যাতে সে পথে পা না বাড়ায় সে ব্যাপারে আমাদের তাদেরকে বুঝাতে হবে। একই সঙ্গে এই গণহত্যা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরো বলেন, মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করছে তা জাতিসংঘের ১৯৬৬-৬৭ সালের সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই সনদে মিয়ানমার সই করেছে। ওই সনদে বলা আছে কোনো শিশু যেদেশে জন্মগ্রহণ করবে, জন্মসূত্রে সে ওই দেশের নাগরিক বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে মিয়ানমার জাতিসংঘের সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন করছে।

তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে যে গণহত্যা চলছে  এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই এবং সেটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে এবার ২৫ আগস্টের পর কত সংখ্যক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে সেটা এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে  সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গাদের যে নিবন্ধন শুরু করেছে সেই নিবন্ধনের সময় প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে নিবন্ধনের পাশাপাশি তাদের কোনো স্বজনকে হত্যা বা ধর্ষণ করা হয়েছে কিনা? হলে, তার নাম, বয়স এসবের একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জাতিসংঘের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

তিনি বলেন, যদি এটা করা যায় তাহলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার মোট সংখ্যাটি পাওয়া যাবে। এ তথ্যটি অনেকটাই নির্ভুল হবে এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর এটি করা গেলে জাতিসংঘে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশের ক্ষেত্রে চীনের ভেটোও এড়ানো সম্ভব। এছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যায় জড়িত মিয়ানমারের সেনাদের বিচার করাও অনেকটা সহজ হবে।’

 

জেবি/জেএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়