• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

‘জান বাঁচাতে প্রসব বেদনা নিয়েই দৌড়েছি’

মুহাম্মদ শাহীনুজ্জামান
|  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৮:২১ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০:৪৯
গেলো ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন আর ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছে সেদেশের সেনাবাহিনী। যে যেভাবে পারছে কোনো মতে জান নিয়ে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। এমনই এক নারী আমেনা খাতুন (২৭) জান বাঁচাতে প্রসব বেদনা নিয়েই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। তিনি আরটিভি অনলাইনকে বললেন তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।    

মংডুর একটি গ্রাম। রাত ১২টা। ওইদিনই আমেনা খাতুনের প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই তাদেও পাড়ায় হামলা করেছে বার্মার মিলিটারিরা। আগুনে পুড়ছে সব। ২ জন আত্মীয় এবং এক প্রতিবেশী এরইমধ্যে মিলিটারির গুলিতে মারা গেছেন। তার ঘরে আগুন দেয়ার ঠিক আগেই জীবন বাঁচাতে দৌড় শুরু করলেন প্রসব বেদনা নিয়েই। কিছুদূর গিয়ে দেখলেন তার ঘরও জ্বলছে।

তিনি বলেন, প্রসব বেদনা নিয়ে কেমন করে যে দৌড়েছি, কি যে কষ্ট হয়েছে সেটা বোঝাতে পারবো না। দৌড়াতে দৌড়াতে পরদিন রাখাইনের কোনো এক পাহাড়ের মধ্যে তিনি তার কোলের শিশুটির জন্ম দিয়েছেন। সন্তান জন্ম দেয়ার পরপরই সেই অবস্থায় হাটতে হয়েছে। কারণ বার্মার মিলিটারিরা দেখলেই গুলি করে মেরে ফেলবে। যে কোনভাবে হোক বর্ডার পার হতেই হবে। অবশেষে বর্ডার পেরিয়ে তিনি নিজেকে এবং তার সন্তানকে বাঁচাতে পেরেছেন।

আমেনার তার স্বামী এতটাই অসুস্থ যে ক্যাম্পের ঝুপড়িতে পড়ে আছেন। তাই সামান্য সাহায্যের আশায়, খাবারের আশায় চার দিনের বাচ্চা কোলে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। একজন রোহিঙ্গা জানালো, এখনো তার (আমেনা) প্রসবের স্থানে ব্যথা করছে। কিন্তু সে অবস্থাতেই নিরুপায় হয়েই তিনি এই চারদিন বয়সী শিশুটিকে নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছেন। 

আমেনা খাতুন আরো বলেন, সেনাবাহিনীরা আমাদের পাড়ায় গুলি করে আমার মামা, মামাতো ভাই এবং আমাদের প্রতিবেশীর এক ছেলেকে মেরে ফেলে। গ্রামের সুন্দর মেয়েদের ধরে নিয়ে গেছে। পালিয়ে আসার সময়ে মেয়েদের উপর গুলি করেছে। সবকিছু রেখে চলে আসতে হয়েছে। যেদিন পাড়ায় আগুন দেয় সেদিনই আমার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছিল। সেই অবস্থায়ই রাত ১২টায় দৌড়ে পালিয়ে এসেছি। আমার বাচ্চাটা বার্মাতেই হয়েছে। বাচ্চা হওয়ার পরও দৌড়াতে হয়েছে।

এদিকে গতকাল (শুক্রবার) মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি সরকার ও দেশটির সেনাপ্রধান মিন অং হিলাইং সহ সামরিক বাহিনীকে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে ‘দোষী সাব্যস্ত’ করেছে কুয়ালালামপুরে স্থাপিত ‘আন্তর্জাতিক গণ-আদালত’।

রোমভিত্তিক সংগঠন পার্মানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালের (পিপিটি) এর সাত ‘বিচারকের’ প্যানেল মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, কাচিন, কারেনসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ২০০ মানুষের জবানবন্দি শুনে এবং বিভিন্ন তথ্যচিত্র ও বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনা করে এই প্রতীকী রায় ঘোষণা করেন।

গেলো ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাখাইনে পুলিশের ৩০টি তল্লাশি চৌকি ও একটি সেনাক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় ১২ পুলিশ নিহত হওয়ার পর ওই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে গেলো বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু এর কোনো তোয়াক্কা না করে আরকানে ফের সেনা মোতায়েন করে নির্যাতন শুরু করে তারা। 

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়