• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

‘বেইজ্জতের ভয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে থেকেছি’

মুহাম্মদ শাহীনুজ্জামান, আরটিভি অনলাইন
|  ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৮:৪৫ | আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৭, ২০:২৩
গেলো মাসের শেষ দিকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ঠিক কত জন রোহিঙ্গা নাগরিক হত্যার শিকার হয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কারো কাছেই নেই। এর একটি প্রধান কারণ, রাখাইন রাজ্যে গণমাধ্যমসহ সবধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত অং সাং সু চির সরকার।

তবে সেখান থেকে যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে আসতে পেরেছেন তারা বলছেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা নির্বিচারে গণহত্যা এবং নারীরা ব্যাপকহারে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যা এখনো চলছে। উখিয়ার বালুখালি শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরে আরটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা হয়ে কয়েকজন শরণার্থীর। তারা বলছেন, পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ রাখাইনে এই গণহত্যা এবং ধর্ষণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। উত্তর রাখাইনের মংডু বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানকার রোহিঙ্গারা অনেকেই পালিয়ে আসতে পেরেছেন। কিন্তু রাখাইনের মংডু থেকে পূর্ব দিকের বুথিডং এবং দক্ষিণ রাখাইনের রাথিডংসহ ওইসব বিস্তীর্ণ এলাকা যা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে অনেক দূরে, যার ফলে সেখানকার অধিকাংশ রোহিঙ্গা পালাতে পারেননি।

সৌভাগ্যক্রমে মংডু থেকে পূর্ব দিকের বুথিডং থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছেন তাদের একজন রহিমা খাতুন (৪০)। তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, তাদের পাড়ার নাম খিয়াদং। এটি রাখাইনের বুথিডংয়ের কাছে অবস্থিত, সেখানে কমপক্ষে ৪০ জন রোহিঙ্গা নারীকে বেইজ্জত (ধর্ষণ) করা হয়েছে। কমপক্ষে ১৫০ জন রোহিঙ্গাকে মগরা (সেনাবাহিনী) হত্যা করেছে। আর ওই পাড়ার বাকিরা কে কোথায় আছে, আদৌ তারা পালাতে পেরেছে কিনা নাকি মারা গেছে তা তিনি এখনো জানেন না। তার পাড়ার অনেক রোহিঙ্গা নারীদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। আর যেসব মেয়েদের গ্রামে ধর্ষণ করা হয়েছে, ধর্ষণের পরপরই তাদের অধিকাংশকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তার স্বামীকেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে এবং মেরে ফেলেছে। 

তিনি আরো জানান, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ১০ দিন হেঁটে তার ছেলেকে নিয়ে উখিয়ার এই বালুখালি শরণার্থী শিবিরে এসে পৌঁছান তিনি।

রহিমা খাতুন বলেন, “মেয়েদের বেইজ্জত (ধর্ষণ) করেছে, নির্যাতন করেছে, সেজন্য আমরা পাহাড়ে পাহাড়ে থেকেছি। বেশি নির্যাতন করেছে আমাদের পাড়ার মেয়েদের। আমাদের পাড়ায় কমপক্ষে ৪০ জন মেয়েকে বেইজ্জত (ধর্ষণ) করেছে। 

আমার স্বামী মারা গেছে। গ্রামের মধ্যে কে কোথায় আছে জানি না। বেশি মারা গেছে যখন গুলি করেছে। কমপক্ষে দেড়শ জন মারা গেছে। ঘরের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দেয়, দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে গুলি মারে। পথের মধ্যে মেয়েদের যাকে পেয়েছে ধরে নিয়ে গেছে। মগে (সেনাবাহিনী) আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। জেলের মধ্যেই সে মারা গেছে। আমাদের ঘরের ভেতর ঢুকে মালপত্র, মুরগি, ছাগল, ভালো কাপড়-চোপড় যা পেয়েছে নিয়ে গেছে। ধর্ষণের ভয়ে আমাদের পাহাড়ে পাহাড়ে থাকতে হয়েছে। এরকম নির্যাতন সহ্য করার মতো না তাই এখানে এসেছি ভাই। 

আমরা এখানে কোনো কিছু নেয়ার জন্য আসিনি। আমার দুই তলা বাড়ি ফেলে এসেছি। জান বাঁচানোর জন্য এই দেশে এসেছি।

‘ক্যাম্পে আমার একটা ছেলে আছে। ছেলেটা পায়ে ব্যথা পেয়েছে, নড়তে চড়তে পারছে না। ডাক্তারখানায় ওকে দেখিয়েছি। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। 

আমরা আমাদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি। আমরা মুসলমানের সন্তান, রোহিঙ্গাদের সন্তান, সেজন্য ওখানে কাউকে কাজে নেয় না। মুসলমানের সন্তান দেখলেই মারে। জেলে ঢুকিয়ে দেয়। আমরা মরলে এদেশের মুসলমানের সরকারের মধ্যে মরে যাবো। এ দেশের সরকার যদি খাবার না দিতে পারে তাহলে মাটি খেয়ে মারা যাব। আমরা অনেক সম্পত্তি ফেলে এসেছি। আমি ৭টা গরু, ৮টা ছাগল, ২০ মণ চাল, ১০ সের মিরকি ধান ও ১৩ মণ কলাই ফেলে এসেছি।

গেলো ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাখাইনে পুলিশের ৩০টি তল্লাশি চৌকি ও একটি সেনাক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় ১২ পুলিশ নিহত হওয়ার পর ওই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে গেলো বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু এর কোনো তোয়াক্কা না করে আরকানে ফের সেনা মোতায়েন করে নির্যাতন শুরু করে তারা। 

 

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়