close
ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ০২ পৌষ ১৪২৪

সিগারেটের চেয়েও কম দাম তামাক শ্রমিকদের

জয়নুল আবেদীন, চট্টগ্রাম
|  ২২ মে ২০১৭, ২৩:৩৯ | আপডেট : ২৩ মে ২০১৭, ০৮:৪৮
তামাক প্রক্রিয়াজাত কারখানায় কাজ করছেন এক নারী শ্রমিক ছবি: জয়নুল আবেদীন
ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর জেনেও সিগারেটের গন্ধ না পেলে ধুমপানে অভ্যস্তদের যেন জীবন চলেনা। খুচরা বাজারে অধিক বিক্রিত গোল্ডলিফ সিগারেটের প্যাকেট প্রতি দাম রাখা হয় ১৬০ টাকা। আর বেনসন সিগারেট বিক্রি হয় ২২০ টাকায়। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ধুমপায়ীরা চড়া দামে সাধারণত এসব সিগারেট কিনে থাকেন। তবে সিগারেটের অন্যতম উপাদান তামাক প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের বেতন এর চেয়েও নিম্নসীমায়। চরম স্বাস্থ্যঝুকি নিয়ে দৈনিক মাত্র ১২৫ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন তারা। বান্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বান্দরবান জেলার ৭ উপজেলার বিশাল এলাকা জুড়ে চাষ হয় তামাকের। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত উর্বর সময়। এরপর জমি থেকে তামাক পাতা তুলে আগুনের চুল্লিতে শুকিয়ে কৃষকরা বিক্রি করেন বিভিন্ন টোবাকো কোম্পানির কাছে। তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাবকে তুচ্ছ মনে করে বেশি টাকা পাওয়ার আশায় প্রতিনিয়ত তামাক চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব এলাকায়। বান্দরবান জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঢাকা টোবেকো, ব্রিটিশ টোবেকো, আবুল খায়ের টোবেকোর একাধিক গুদাম রয়েছে। 

বান্দরবানের লামার হরিনজিরি এমন একটি এলাকা, যেখানে তামাক প্রক্রিয়াজাত করেন শ্রমিকরা। সেখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তামাক শ্রমিকদের নানা কষ্টের দৃশ্য। উপজেলার সদর এলাকা হরিনজিরিতে বিশাল পরিসরে তামাকের গুদাম তৈরী করেছে ঢাকা টোবাকো। তামাক বাছাই ও তামাকের বান্ডিল তৈরী, গাড়িতে লোড-আনলোড কাজে ৫ শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন এই গুদামে। তবে গুদামে প্রায় সবাই নারী শ্রমিক। যেসব পুরুষ কাজ করেন তারা কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেখানে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব রোকেয়া বেগমের সঙ্গে। স্বামী হারা এই বৃদ্ধা ২ ছেলে আব্দুর রহমান আর রবিউল হোসেনকে সঙ্গে নিয়েই থাকে। এক মেয়ে ছিল বিয়ে দিয়েছেন। কোনো ধরনের নিরাপত্তামূলক মুখোশ ছাড়াই তামাকের গুড়া থেকে অপেক্ষকৃত বড় অংশগুলো বাছাই করছেন। তার মতো অনেকেই একাজে জড়িত রয়েছেন পেটের দায়ে। তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে জানেন কিনা জিজ্ঞেস করলে কান্নাজড়িত কণ্ঠেই জানালেন, নিজের অসহায়ত্বের কথা। শেষ বয়সে জীবিকার তাগিদেই তার প্রতিদিনের এই লড়াই।

পঞ্চাশোর্ধ্ব রেহেনা বেগমও জানালেন নিজের নানা অসুস্থতার কথা। হৃৎরোগে আক্রান্ত এই বৃদ্ধার শ্বাসকষ্ট এখন নিয়মিত। নিজের ৫ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, 'ছুডু মেয়ের লগে থাকি। জামাইয়ের কাছ থিকি তো আর সব চাওয়া যায়না। মেয়ে জামাই দুইটা ভাত না দিবো। অসুখ বিসুখ লাগি থাকে। সংসারের নানা সমস্যা সামলাতি হয়।  এখানেতো কিছু টাকা হইলেও পাই। বসি থাকলে ১০ টাকাও কেউ দেবে না।'

এই গুদামের আরেক শ্রমিক শাপুলি বেগম। বয়স ৪০। এই তামাকের গুদামে কাজ করার পর কলিজায় ঘা হওয়ায় এখন আর তিনি কাজ করতে আসেন না। এসব কথা জানান আরেক শ্রমিক রেহেনা বেগম। তিনি বলেন, 'শাপুলির চিকিৎসার জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো টাকা দেয়া হয়নি। আল্লাহ গরিব বানাইছে কি করবো। শরীরের ক্ষতি জেনেও কাজ করি। গরীব হওয়ার চেয়ে কষ্ট করে মরে যাওয়ায় ভালো।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কাজ করেন তারা। মজুরি পান দৈনিক মাত্র ১২৫ টাকা পাই। যারা তামাক পাতা বাঁধে তাদের দৈনিক ভাতা ১৪০ টাকা। শুক্রবার থাকে বন্ধ।  '১২৫ টাকা দিয়া কি বাজারে যাওন যায়? চাল কিনিবো নাকি তরকারি? কোম্পানিরে ৩ বছর ধইরে কয়েও ১ টাকা বেতন বাড়ানো যায়নি!' বলে দম নেন তিনি। 

'সপ্তাহে একবার একসঙ্গে ৬ দিনের বেতন দেয়। ৬ দিনের বেতন থেকে প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে ১০ টাকা করে কেটে নেয় শ্রমিকদের সর্দার আবু মিয়া।' 

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২৫ টাকার মধ্যে যাতায়াত ভাড়াও দৈনিক ৩০ টাকা চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে সংসার চলে। অসুখ হইলে ধার করতে হয়। বাংলা চৈত্র মাস থেকে জৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত চলে কাজ। বাকি সময়টা পাহাড়ে কাঠকাটাসহ অন্যান্য কাজ করে সংসার চালান তারা। 

জানা গেছে, এখানে বছরের পর বছর শ্রমিকরা কাজ করলেও তাদের নেই কোনো চিকিৎসা ভাতা, নেই অন্যান্য কোনো সুযোগ সুবিধাও। কেবল দৈনিক মজুরিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় শ্রমিকদের। 

লামার ঢাকা টোবেকোর গুদামের ম্যানেজার পদে আছেন নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, দায়িত্বে আছি ঠিকই। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ আমার নেই। এখানে কেবল তামাক গুদামজাত করা হয়। এরপর কারখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।' 

শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানা থাকলেও কোম্পানি এ বিষয়ে তাকে পৃথক কোনো নির্দেশনা দেয়নি বলে জানান তিনি।
 
জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর সবশেষ হালনাগাদে দেখা যায়, পোশাক শিল্পে সর্বনিম্ন দৈনিক মজুরি ধরা হয়েছে ২০৪ টাকা। অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও আছে। বস্ত্র শিল্পে অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি দৈনিক ১৭৬ টাকা, পাট শিল্পে অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৬৫ টাকা। তাছাড়া দিনমজুরদের দৈনিক মজুরিও ৪শ' টাকার কম নয়। সে তুলনায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা তামাক শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেন দৈনিক ১২৫ টাকা। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী আরটিভি অনলাইনকে জানান, ধুমপায়ীদের চেয়ে তামাক শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি বেশি। তামাকের কাজ করার সময় তামাকের ছোট ছোট কণা নাকের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। এতে ফুসফুসে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাছাড়া নাক, কান ও চোখে তামাকের কারণে নানা রোগ হতে পারে। 

নারী শ্রমিকদের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তামাকের প্রভাবে পেটের বাচ্চা নষ্ট হতে পারে। বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম হতে পারে। তামাকের কাজ করার সময় শ্রমিকদেরকে মুখে মাস্ক, কানে তুলো এবং চোখে চশমা পরতে হবে। মরণঘাতি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এসজে

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়