ট্র্যাফিক ব্যবস্থা উন্নত করা সম্পর্কিত কিছু ইস্যু

প্রকাশ | ১১ মার্চ ২০১৮, ১৫:১৬ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৮, ১২:৫৩

মোহাম্মদ জমির

শহর এলাকা বিশেষ করে ঢাকায় ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গেলো চার সপ্তাহ ধরে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। কাজের জন্য বা মার্কেটে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য নাগরিকরা বাসা থেকে বের হওয়ার পর যে ভোগান্তির শিকার হন সেটির ওপর ভিত্তি করেই এত আলোচনা-সমালোচনা। ট্র্যাফিক ব্যবস্থা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো দখল করে নিতে শুরু করেছে।

কয়েকদিন আগে আমার বাসা ধানমন্ডি থেকে বারিধারা গিয়েছিলাম। নয় কিলোমিটার দূরত্বের এই পথটুকু পাড়ি দিতে আমার সময় লেগেছে এক ঘণ্টা ৫০ মিনিট। আর ফিরতে সময় লেগেছে এক ঘণ্টা ৪৬ মিনিট। তবে দূরত্ব ও সময়ের বিবেচনায় পান্থপথ হয়ে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত পৌঁছতেই বেশি সময় লেগেছে। ধানমন্ডি থেকে প্রায় দেড় মাইলের এই পথটুকু পাড়ি দিতে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ মিনিট লাগে। তাই ঢাকার রাস্তায় চলা ‘সময়ের অপচয়’ ছাড়া আর কিছু নয়, এই প্রবাদবাক্যটি যেন সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে দুর্ভাগা হচ্ছে পথচারীরা, কেননা আটকে থাকার গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্য দিয়েই হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয় তাদের। বিশেষ করে শিশুদের তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় এর মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে হয়।

ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত রাস্তায় এত যানজট। রাস্তার মোড়ে লাগানো ট্র্যাফিক লাইটের ব্যবহার কেন করা হয় না সেটি কারও বোধগম্য নয়। তখন প্রশ্ন ওঠে সোলার প্যানেলের সাহায্যে লাগানো এসব ট্র্যাফিক লাইট কেন কাজ করছে না? অনেকে বলেন প্রায় সব সোলার প্যানেল নোংরা এবং ফিটও নয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার। এসব প্যানেলে ঠিকমতো দেখভাল করা হলে ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই গতি আসবে। যা সব পক্ষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

রাস্তার মোড়ে বিভিন্ন দিক থেকে আসা গাড়িগুলো ট্র্যাফিক পুলিশ যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেটি নিয়েও ভাববার সুযোগ আছে। বিজয় সরণি ও ফার্মগেট মোড়ে জ্যাম লেগেই থাকে। আর সোনারগাঁও হোটেল ও পিজি হাসপাতাল মোড়েও বিশেষ নজর দেয়া জরুরি। এসব জায়গায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায় যখন পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ বাদ দিয়ে এলোমেলোভাবে রাস্তা পারাপারের চেষ্টা করে। অবশ্য, এভাবে যারা রাস্তা পার হন তাদের জরিমানার চেষ্টা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা তবে সেটির ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় না।

এরপর নিয়ম ও লেন মেনে গাড়ি চলাচলের প্রশ্নটি সামনে আসছে। কিন্তু এটা কখনও ঘটে না। এর ফলে পরিস্থিতি হতে পারে যে মিরপুর রোডের মতো ব্যস্ত সংযোগ সড়কের কার্যকারিতা চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার মতো বিষয় ঘটতে পারে।

প্রতিনিয়ত সকাল কিংবা রাতে রিকশা, রিকশা ভ্যান, ঠেলাগাড়ি রাস্তা আটকে ও বাস, ট্রাক, ভ্যান ও গাড়ির সঙ্গে জায়গা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে। এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল, যারা রাস্তায় লেন ক্রস করার সময় নিয়ম মেনে চলে না।

দিনের নির্ধারিত সময়ে বিশেষ করে সকাল ৯টা থেকে ৬টা (অফিসের সময়) এবং রাত ৮টা সময় পর্যন্ত পুলিশ কেন ধীরগতির গাড়ির ব্যাপারে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেয় না সেটাই সবার প্রশ্ন। এটি করা হলে নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেত মোড়ে জ্যাম ব্যাপকভাবে কমে আসবে।

আরও একটি দিক রয়েছে যেটি অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করছে। একটি দ্বিমুখী রাস্তা সম্ভাব্য তিনটি করে লেন, এর ফলে অনেক সময় রাস্তার দুপাশে পাঁচ থেকে ছয়টি লেন তৈরি হয়ে যায়। রাস্তায় যে যার ইচ্ছা মতো গাড়ি রাখায় এটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাঝ রাস্তায় হঠাৎ করে বাস থামানোর বিষয়টিও। যান চলাচলের বিষয়টি এড়িয়ে রাস্তার মাঝখানেই বাস থামিয়ে (অনির্ধারিত স্থানে) যাত্রী উঠানো-নামানোর জন্য এটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এ ঘটনায় সংঘর্ষের ও দুর্ঘটনার মতো বিপদ রয়েছে, যেখানে যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। যে বাসগুলো নির্ধারিত স্থানে থামছে না, রাস্তায় লাগানো ক্লোজ সার্কিট টিভি দিয়ে সেগুলোকে চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে উল্টো পথে যাওয়ার সময় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের গাড়িসহ বিভিন্ন গাড়ি জরিমানা করার মতো পুলিশকে কিছু ভালো কাজ করতে দেখেছি আমরা। সবাই এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযান শুরু হওয়ার পর আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।

বিশেষ করে ঢাকার এক কোটি ৭০ লাখ বাসিন্দা সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়া, যদি সেটি নাও হয় তবে পুরো এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বাজে ট্র্যাফিক ব্যবস্থার শিকার হচ্ছেন। অনেক ফ্লাইওভার বানিয়ে ট্র্যাফিক জ্যাম কমানোর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্লাইওভার থেকে নেমে মোড় পার হয়ে কাঙ্ক্ষিত রাস্তায় যাবার আগে এক্সিট পয়েন্টে প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত আটকা পড়ে থাকতে হয়। তবে এ সমস্যা সমাধানে বেলজিয়াম ও ফ্রান্স এবং জার্মানির কিছু অংশে দারুণ এক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। গাড়ি ফ্লাইওভার থেকে নামার পর সামনের দিকে যেতে মোড় নিয়ে ব্রিজের নিচে একটি প্যাসেজ বা টানেল ব্যবহার করে। ফলে অন্য পাশ থেকে আসা গাড়ি ট্র্যাফিকের গতির কোনো ব্যাঘাত না করেই বাঁ বা ডান দুদিক থেকেই আসতে পারে।

সম্প্রতি ট্র্যাফিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার যানজটের অবস্থা নিয়ে জরিপ চালিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শহরের মাত্র ৬ থেকে ৮ ভাগ যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যক্তিগত যানবাহন (গাড়ি ও অটোরিকশা) ব্যবহার করে। যদিও রাস্তার প্রায় ৬৫ ভাগই থাকে এসব গাড়ির দখলে। অন্যদিকে শহরের ৬০ ভাগ যাত্রীবহনকারী গণপরিবহন দখলে থাকে রাস্তার মাত্র ১০ ভাগ।

রাস্তার যেখানে সেখানে এলোমেলোভাবে গাড়ি পার্কিং করার কারণে প্রায় সময়ই জায়গা দখল হয়ে যায় ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে রাস্তা দখলের কারণে যান চলাচলের জায়গা কমে আসে। ফুটপাতে অবৈধ দোকান (পথচারীদের হাঁটা বাধার সৃষ্টি করে) ও রাস্তার পাশেই দোকানের  কারণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায়। এটি বন্ধ করা জরুরি।

ট্র্যাফিক ব্যবস্থায় সমস্যা সৃষ্টিকারী আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর সেটি হচ্ছে আমাদের শহরের রাস্তার হতাশাজনক অবস্থা বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এটা খুব ভালো যে ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এ সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো, যা ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনাকে রূপান্তরে সাহায্য করছে।

মেট্রো রেলসহ আরও উন্নত গণপরিবহনের সংযোজন যাত্রীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। এর ফলে ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহার ও যানজট কমে আসবে। তবে এর জন্য আমাদের আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে কিন্তু অপেক্ষার ফল হবে অমূল্য।

আরও পড়ুন: 

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার।

[email protected]