• ঢাকা শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫

'ঢাকা থেকে টেলিগ্রাম পেলাম, গোলাগুলি হয়েছে'

সিয়াম সারোয়ার জামিল
|  ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:৩১ | আপডেট : ০৪ মে ২০১৭, ১৮:৪১
[সাভার উপজেলা কমপ্লেক্স লাগোয়া একতলা টিনের বাড়ি। গেট খুলে এগোতেই দেখা মিলল তাঁর। লাঠিতে ভর করে এগিয়ে আসতে চাইলেন লম্বা মানুষটা। পারলেন না। কোমরের ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন। চুরাশিতে এসে নুয়ে পড়েছে শরীরটা। দীপ্ত চোখে তাকালেন আগুন্তুকের দিকে।  মুখে প্রাণখোলা হাসি দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ দেখালেন। বসলেন বিছানায়। পরম আদরে কাছে টানলেন। তারপর চারদিক আলো করে কথা বলে উঠলেন জয়নাল আবেদীন খান। বায়ান্নো'র ভাষা আন্দোলনের বীরসৈনিক।

শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। থাকেন ছোট মেয়ের পরিবারের সঙ্গে। স্ত্রী প্রায় ১০ বছর শয্যাশায়ী। জন্ম ১৯৩২ সালের ১৯ নভেম্বর, পাবনার সাঁথিয়ায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। আগের রাতেই সময় চেয়েছিলেন এ প্রতিবেদক। কথা বলতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু সামনে যেতেই নিষ্প্রভ মনে হলো তাকে। সাক্ষাৎকারে ভীষণ অনাগ্রহ। প্রচারবিমুখ। বলা চলে লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিলেন সারাটি জীবন। এতো যে অর্জন, মুখ ফুটে তার কিছুই বলতে চান না।

বায়ান্ন'র একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গোলাগুলির খবর শুনে আন্দোলনের সমর্থনে পাবনার রাস্তায় নেমেছিলেন। গড়েছিলেন শহীদ মিনার। বাষট্টি'র শিক্ষা আন্দোলনে তার ছিল গণতান্ত্রিক সংগ্রামসহ ভূমিকা। ১৯৬২ সালে পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। দেশ স্বাধীনের পর সরকারি চাকুরি করেছেন দীর্ঘদিন।

অবসর শেষে যুক্ত আছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সঙ্গে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বায়ান্ন'র ভাষা আন্দোলন, পরবর্তী রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতি, তার শৈশব সব বিষয় নিয়েই আরটিভি অনলাইনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন জয়নাল আবেদীন খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিয়াম সারোয়ার জামিল ]

আরটিভি অনলাইন : একুশে ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল?

জয়নাল আবেদীন খান : আগে থেকেই খবর পেয়েছিলাম, একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙা হতে পারে। ওই সময় আমি পাবনায় ছিলাম। ঢাকা থেকে টেলিগ্রাম পেলাম, গোলাগুলি হয়েছে। ওইদিন মিটিং করে পরদিন বিক্ষোভ ডাকলাম। পুরো পাবনায় জনগনের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে ধর্মঘট পালন করলাম। মুসলিম লীগের গুণ্ডারা বিভিন্ন স্থানে হামলা করেও কর্মসূচী ঠেকাতে পারেনি। ওই সময় রণেশ মৈত্র, কামাল লোহানীসহ আরো অনেকেই পাবনার ভাষা আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছেন।

আরটিভি অনলাইন : পরে শহীদ মিনার গড়েছিলেন?

জয়নাল আবেদীন খান : হ্যাঁ। গোপনে শহীদ মিনার বানিয়েছিলাম। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। আমরা যে মডেল বানিয়েছিলাম, তা এখন আর নেই। নতুন মডেলে বানানো হয়েছে।

আরটিভি অনলাইন : রাজনীতিতে জড়ালেন কিভাবে?

জয়নাল আবেদীন খান: ১৯৪৮ সালে আমি একবার পাবনার মেলায় গিয়েছিলাম। সেখানেই কমিউনিষ্ট পার্টির এক কমরেডের সঙ্গে পরিচয়। তার হাত ধরেই রাজনীতিতে আসা। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। প্রকাশ্যে আমরা আওয়ামী লীগকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতাম।

আরটিভি অনলাইন : শৈশবের কথা বলেন

জয়নাল আবেদীন খান : শৈশব কেটেছে পাবনার সাঁথিয়ার গৌরিপুর গ্রামে। একেবারেই অজপাড়াগাঁ যাকে বলে, গ্রামটা ছিল ওরকম। হিন্দু মুসলমান উভয়েই সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করতেন। সাড়ে তিন মাইল পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম। কৃষক পরিবারের ছেলে। মা প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করেননি। কিন্তু বাংলা পড়তে লিখতে পারতেন। আমি তাঁর কাছ থেকেই প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাটা পেয়েছি। শৈশবে আমি খুব দুষ্টু ছিলাম। একদল ডানপিটে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। এলাকায় সবাই বলত ‘আবেদীনের দস্যু বাহিনী’।

আরটিভি অনলাইন : আপনি ছাত্র রাজনীতিতে বেশ পরিচিত হয়েছিলেন

জয়নাল আবেদীন খান : হ্যাঁ। একুশে ফেব্রুয়ারির ক'দিন পর খবর পেলাম, ঢাকায় নতুন একটা ছাত্র সংগঠন হচ্ছে। রাজশাহীর কমিউনিষ্ট নেতা আতাউর ভাই আমাদের যেতে বললেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত যাবার সুযোগ হয়নি। তবে ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সম্মেলনে আমি গিয়েছিলাম। মোহাম্মদ সুলতান ভাইকে সভাপতি আর ইলিয়াস ভাইকে সাধারণ  করে কমিটি হয়েছিল। যারা ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করেছিলেন প্রায় সবাই ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রথমে রাস্ট্রবিজ্ঞানে, পরে মাইগ্রেশন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। এরপর আরো সক্রিয় হই রাজনীতিতে। ধাপে ধাপে ১৯৬২ সালে আমি ডা আহমেদ জামান, কাজী জাফরের কমিটিতে কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব নিই।

আরটিভি অনলাইন : কারাগারে গেছেন?

জয়নাল আবেদীন খান :  ৪ বারে প্রায় চার বছর থেকেছি। জেলে অনেক কিছু শিখেছি। রাজনীতি শেখার বড় জায়গা জেল। জেলে বসেই মিটিং করতাম। জেলের মেয়াদ শেষে বেরিয়ে পরিকল্পনামাফিক কাজ করতাম আমরা।

আরটিভি অনলাইন : ভাষাসৈনিকদের তালিকা সঠিক বলে মনে করেন?

জয়নাল আবেদীন খান : তালিকার একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আহমদ রফিক দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সে তালিকায় কারা কারা আছেন আমি জানি না। আমি নিজেও আছি কী না- জানি না। তাই বলতে পারছি না, সেটা কতটা সঠিক। তাছাড়া স্বীকৃতির জন্যে তো আমরা আন্দোলন করিনি।

আরটিভি অনলাইন : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি যেমনটা ঘটেছে, ভাষা আন্দোলনেও কী বিকৃতি ঘটেছে?

জয়নাল আবেদীন খান : সেটা তো ঘটেছেই। একশ' ভাগ সত্য ইতিহাস কোথাও পাওয়া যাবে না। একটা বাড়ি যদি ৩ জন মিলে ঘুরে ঘুরে দেখি, ৩ জন একরকম বক্তব্য দেবেন না। তবে আমি মনে করি, শতভাগ না হলেও অন্তত ৯০ ভাগ সঠিক রেখে পর্যবেক্ষণগুলো করা উচিত।

আরটিভি অনলাইন : রাষ্ট্রীয় কোন পুরস্কার বা সম্মাননা পেয়েছেন কী?

জয়নাল আবেদীন খান : না। এখন পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মাননা পাইনি। আর ওসবে কী হবে! মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটা কী কম!

 

এসজে/

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়