• ঢাকা সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

মেলার আদি বচন

মিথুন চৌধুরী
|  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪:২৯ | আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৫:১৩
১৯৭২ সালে প্রথম একুশে বইমেলা
শীতের চাদর ফেলে কুয়াশার প্রভাত কাটিয়ে বসন্তের আগমনে প্রকৃতি সাজছে নববধূর সাজে। অতিথি প্রেমিক কোকিল ডাক দিয়ে জানান দিচ্ছে আগমন বার্তার। তাতে ভিন্নমাত্রা যোগ দিতে ভাষার মাসে শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা।

বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি বোধ ও ঐতিহ্য হলো অমর একুশে বইমেলার ভিত্তি। প্রাচীন এতিহ্য ধারণ করে এ মেলাকে ঘিরেই বাঙালি জাতির সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটছে। লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের কাছে  বইমেলা এক সেরা উৎসব। সবার-ই মিলনমেলা। এদেশের সব শ্রেণির পাঠক সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন কখন বসবে বইমেলা, কবে বসবে বাঙালির মিলনমেলা।

ভাষা আন্দোলন, বাংলা একাডেমি আর একুশে বইমেলা একইসূত্রে গাঁথা। একুশের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ফসল বাংলা একাডেমি। একুশে বইমেলা বিকশিত হয়েছে একে কেন্দ্র করে। নবগঠিত বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক জাগরণের প্রথম প্রকাশ ‘অমর একুশে বইমেলা’।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার আয়োজন করা হয়। ভাষা আন্দোলনের গৌরবের স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই বইমেলার নামকরণ হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’।

বইমেলার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এর ইতিহাসের সঙ্গে যে নামটি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে তিনি চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গনে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকতা থেকে আনা ৩২টি বই দিয়ে বইমেলা শুরু করেন। বাংলাদেশি শরনার্থী লেখকদের লেখা এই বইগুলো প্রকাশিত হয় তার প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে। যার বর্তমান নাম মুক্তধারা প্রকাশনী। ১৯৭২-১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বইমেলা চলে এভাবেই। তার প্রচেষ্টায় এই মেলা বিকশিত হতে থাকে ক্রমাগত।

১৯৭৬ সালে বইমেলার প্রতি উৎসাহিত হন অন্য প্রকাশকরা। বইমেলার পরিধি বাড়তে থাকে। পরের বছরে বিক্রেতার সংখ্যা বেড়ে যায়। ১৯৭৮ সালে বইমেলা পূর্ণাঙ্গ মেলায় রূপান্তরিত হবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। তখনকার মহাপরিচালক ড.আশরাফ সিদ্দিক বাংলা একাডেমিকে বইমেলার সঙ্গে যোগ করার ঘোষণা দেন। তখন থেকেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে বাঙালির প্রাণের মেলা শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। ওই বছরই বাংলা একাডেমির সঙ্গে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি যৌথভাবে বইমেলার আয়োজন করে। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি বইমেলার জন্য বিধিবদ্ধ নীতিমালা প্রণয়ন করে। একইসঙ্গে এই বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’। ওই সময় থেকে গৌরবের সঙ্গে প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলা আয়োজিত হয়ে আসছে।

গুটি কয়েক বই নিয়ে যে মেলা শুরু হয়েছিল, তা আজ বাঙালির প্রাণের মেলা। অমর একুশে বইমেলা এখন আমাদের ঐতিহ্যের বিরাট অংশীদার।

আশির দশকে মেলার পরিধি, চিত্র এবং আয়োজনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেতে থাকে দ্রুত, বাড়তে থাকে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ১৯৮০ সালে বইমেলায় অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩০। ১৯৮৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২তে এবং ১৯৯১ সালে এ সংখ্যা ১৯০তে উন্নীত হয়।

বইপ্রেমীদের জোয়ারে সব প্রতিবন্ধকতার বাঁধ ভেঙে যায় ১৯৯২ সালে। ওই বছর অমর একুশে বইমেলায় অংশ নেয় মোট ২৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠান ও বইপ্রেমীদের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বইমেলার পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়। বাংলা একাডেমির দেয়াল ভেঙে বৃদ্ধি করা হয় মেলার স্থান। জনগণের প্রবেশ পথ হয় প্রসারিত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন দু’পাশের রাস্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলন চত্বর থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে অমর একুশে বইমেলার পরিধি। স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার আয়োজন শুরু হলেও তা পূর্ণতা পায় মূলত নব্বইয়ের দশকে।

২০১৪ সাল থেকে অমর একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমির মুখোমুখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়।  আগে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা নিয়মিতভাবে হতো। এরপর ক্রেতা, দর্শক ও বিক্রেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারির শেষ দিন পর্যন্ত এই মেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মেলা নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে। প্রকাশনীসমূহের স্টলগুলো প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্ণার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি এলাকায় বিভাজন করে স্থান দেয়া হয়। এছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ  ব্যক্তির নামে ভাগ করা হয়।

এই মেলায় দেশের খ্যাতনামা সব প্রকাশনী, বই বিক্রেতা ছাড়াও ভারত, রাশিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশ থেকেও নানা সংস্থা তাদের বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশ নেন। এ মেলায় সরকারেরও বহু রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান-বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইত্যাদি তাদের স্টল নিয়ে অংশ নেয়। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও অংশ নেয়।

মেলাতে ইদানিং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রকাশনা-সিডি, ডিভিডি ইত্যাদিও স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের সেবার বিবরণসহ উপস্থিত হয়। মেলাতে বেশ জনপ্রিয়তার সঙ্গে স্থান করে নিয়েছে লিটল ম্যাগাজিনও। মেলার মিডিয়া সেন্টারে থাকে ইন্টারনেট ও ফ্যাক্স ব্যবহারের সুবিধা। এছাড়া থাকে লেখক কর্ণার এবং তথ্যকেন্দ্র।

মেলা প্রাঙ্গণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত। মেলায় বই বিক্রিতে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় থাকে। এছাড়া মেলায় শিক্ষা সহায়ক পরিবেশ ও তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স রাখা হয়, যারা বইয়ের কপিরাইট বা মেধাসত্ত্ব আইন লঙ্ঘন করেছে কি-না শনাক্ত করেন ও যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেন। মেলায় প্রবেশের জন্য ছুটির দিন ও অন্যান্য দিন আলাদা প্রবেশ সময় থাকে। মেলায় প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ ফি নেয়া হয় না।

মেলা চলাকালীন প্রতিদিনই আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর বসে; প্রতি সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া মেলাতে লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন মোড়কে উন্মোচিত বইগুলোর নাম, তার লেখক ও প্রকাশকের নাম ঘোষণা করা হয় এবং দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল মেলার মিডিয়া স্পন্সর হয়ে তাৎক্ষণিক খবরাখবর দর্শক-শ্রোতাদেরকে অবহিত করে।

এছাড়া মেলার প্রবেশ পথের পাশেই স্টল স্থাপন করে বিভিন্ন রক্ত সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে তা সংগ্রহ করে থাকে।

২০১০ সাল থেকে এই মেলার প্রবর্তক চিত্তরঞ্জন সাহার নামে পদক প্রবর্তন করা হয়। আগের বছরে প্রকাশিত বইয়ের গুণমান বিচারে সেরা প্রকাশককে এই পুরস্কার দেয়া হয়। পুরস্কারটির আনুষ্ঠানিক নাম 'চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার'। এছাড়া স্টল ও অঙ্গসজ্জার জন্য দেয়া হয় 'সরদার জয়েনউদদীন স্মৃতি পুরস্কার'। সর্বাধিক বই কেনার জন্য সেরা ক্রেতাকে দেয়া হয় 'পলান সরকার পুরস্কার'।

এমসি/ডিএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়