• ঢাকা সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫

যুদ্ধদিনে বাঙালির সঙ্গী বিশ্ব গণমাধ্যম

শাহেদ জাহিদী
|  ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৩:৪৩ | আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:০৮
কম কথাতো না! কত রক্ত আর সম্ভ্রম, কত ত্যাগের বিনিময়েই না বিজয় অর্জিত হয়েছে একাত্তরে।

টাইম ম্যাগাজিনের ভাষায়-Bloody Birth of Bangladesh.

মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই শুরু থেকেই বিশ্ব মিডিয়ার ভূমিকা ছিল পেশাদারিত্ব আর দায়িত্বশীলতা পূর্ণ।

সব  গণমাধ্যমেই ১৯৭১ মূর্ত হয়েছে বস্তুনিষ্ঠভাবে। বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার খবর চেপে রাখতে চেয়েছে বিদেশি সাংবাদিকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে, দেশ থেকে বের করে দিয়ে।

কিন্তু হত্যাসহ যাবতীয় পৈশাচিকতার খলনায়কেরা হত্যা করতে পারেনি সত্যকে। সংবাদকর্মীরা অকুতোভয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই আক্রান্ত পূর্ব বাংলার প্রকৃত খবর জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। আর তাতেই গড়ে ওঠে বিশ্বজনমত, যা সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ে।

২৫ মার্চ, ১৯৭১। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম আক্রমণ চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের বর্বর এ অভিযান সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অন্ধকারে রাখার অপচেষ্টা চালায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনী।

২৫ মার্চ রাতে ও পরদিন সকালে ঢাকায় হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে থাকা বিদেশি সাংবাদিকদের মেরে ফেলার ভয়-ভীতি দেখানো হয়। আটকে রাখা হয় সবাইকে। পরে ঢাকা থেকে তাদের করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। এবং পাকিস্তানের বাইরে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু কিছু হোটেলকর্মীর সহযোগিতায় সে রাতে হোটেলেই লুকিয়ে থাকেন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ রিপোর্টার সাইমন ড্রিং এবং ফটো সাংবাদিক মাইকেল লরেন্ট।

তারা দু’জন হোটেলের ছাদে উঠে যদ্দুর সম্ভব চারদিকের অবস্থা দেখে নেন। পরে কারফিউ তুলে নেয়া হলে শহর ঘুরে অপারেশনের আলামত লক্ষ্য করেন, ছবি তোলেন।

শেষ পর্যন্ত প্লেনে করাচি হয়ে ব্যাংকক পৌঁছে সব ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন কাগজে পাঠান ছাপার জন্য। ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনই ছিল পাকিস্তানের সামরিক অপারেশনের প্রথম তথ্যনির্ভর বিবরণ-যা পড়ে বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল-Tanks Crush Revolt in Pakistan, 7000 Slaughtered, Homes burned. অর্থাৎ ট্যাঙ্ক নামিয়ে পাকিস্তানে বিদ্রোহ দমন, ৭০০০ মানুষ হত্যা, বাড়ি ঘর পুড়ে ছাই

দেশে তখন আরোপিত ছিল ‘প্রেস সেন্সরশীপ’। খবর প্রকাশের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। সে অবস্থায় বিদেশি সাংবাদিকদের কলম কিংবা কণ্ঠরোধ করার সামরিক বুদ্ধি অসার প্রমাণিত হয়।

সাইমনের প্রতিবেদন সুবাদে বিশ্ববাসী ঠিকই জেনে ফেলে-কী ভয়াবহ পৈশাচিকতা চলছে পূর্ব বাংলায়!

এপ্রিলে পাকিস্তান সামরিক সরকার ৮ জন সাংবাদিককে ঢাকায় এনে হাজির করে। উদ্দেশ্য-ঢাকার ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা বিশ্ববাসীকে জানান দেয়া। কিন্তু আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের মধ্যে খোদ করাচির সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস প্রোপাগান্ডা ছড়াতে সহযোগিতার বদলে তুলে ধরেন আসল চিত্র।

পূর্ব বাংলায় ১০ দিন থেকে তিনি প্রতিবেদন করলেন যুদ্ধাপরাধের নানা তথ্য নিয়ে। ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে সেটি ছাপা হয় দ্য সানডে টাইমসে। ৭১ এর ১৩ জুন প্রকাশিত সেই লেখা বিরাট ভূমিকা রাখে ইতিহাস বদলে দিতে।

আর করাচির ‘মর্নিং নিউজ’র সাবেক সহকারি সম্পাদক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তার জেনোসাইড’এ বয়ান দিয়েছেন যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার। পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতার পাশাপাশি গোলাম আজমের মতো দালাল-রাজাকারদের ন্যাক্কারজনক কার্যকলাপের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে অ্যান্থনির এ লেখা। এতে উঠে এসেছে কুমিল্লায় হিন্দু হত্যায় মেতে ওঠার চিত্র। পাকিস্তানের ‘কিল অ্যান্ড বার্ন’ বা হত্যা ও জ্বালাও পোড়াও তাণ্ডবে জড়িত সেনাকর্তাদের আলাপেরও উদ্ধৃতি মেলে তার প্রতিবেদনে।

‘২০ লাখ মানুষ মেরে হলেও পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিমুক্ত করা হবে’-সিনিয়র সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের এমন দম্ভোক্তিরও উল্লেখ আছে অ্যান্থনির লেখায়।

পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন আদায়ে কীভাবে দ্রুততম সময়ে প্লেনে করে ২৫ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে বাংলাদেশে আনা হয়, সেটিরও বিশদ বর্ণনা মেলে। লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের দালালদের সমর্থন পেতে কয়েক সপ্তাহ ধরে লেগে থেকেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।

মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচে’ তাৎপর্যপূর্ণ লেখাগুলোর একটি এই জেনোসাইড এমন এক সময় প্রকাশিত হয়, যখন পূর্ব বাংলা বিচ্ছিন্ন-অবরুদ্ধ। সেক্ষেত্রে আসল অবস্থা জানতে পেরে সোচ্চার হয়ে ওঠে সারাবিশ্বের মানুষ। দিকে দিকে উচ্চারিত হতে থাকে ‘স্টপ জেনোসাইড’-গণহত্যা বন্ধ কর

ঢাকা থেকে তাড়ানো বিদেশি সাংবাদিকদের অন্যতম মার্টিন অ্যাডনি। ২৬ মার্চ গার্ডিয়ান পত্রিকায় তিনটি প্রতিবেদন ছাপা হয় তার। এসব লেখায় উঠে আসে পাকিসেনাদের নানা বর্বরতার ছবি।

মার্টিন এক প্রতিবেদনে বলেন, অখণ্ড পাকিস্তানের নামে নিরস্ত্র জনতার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চলছে সামরিক সরকারের। আর তাতে নিশ্চিত হলো-পাকিস্তান আর এক থাকতে পারে না। দু’বছর, পাঁচ বছর বা ১০ বছর-যত দিনই লাগুক না কেনো, দেশটা ভাগ হবেই।

বাংলার এমন পরিস্থিতিতেও পাকিস্তানের  ‘পোড়া মাটি’ নীতি বহাল রাখার বিরুদ্ধে পশ্চিমা রাষ্ট্রনায়কেরা কোন পদক্ষেপ নেননি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীনের নীতি ছিল বাঙালির আকাঙ্খা বিরোধী। কিন্তু সে সব দেশের গণমাধ্যমের সুবাদে বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুতই গড়ে ওঠে জনমত।

বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও মিডিয়া ঠিকই সরব থেকেছে মানবতার এ বিপর্যয়ে। কথা বলেছে মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষে, পাকিস্তানের বর্বরতার বিরুদ্ধে।

পশ্চিমা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যম কেউ দ্রুত, কেউ ধীরে হলেও তুলে ধরেছে ৭১-র সত্য। নিষ্ঠুরতা-বর্বরতা ধরা পড়েছে বিদেশি সাংবাদিকের ক্যামেরায়, তা ভাষা পেয়েছে কাগজে।

পাকিস্তান বিষয়ে মার্কিন নীতির সমালোচনায় মুখর থেকেছে সেদেশেরই নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজ উইক, ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম এবং নামি-দামি আরো সব কাগজ।

পাকিস্তানি সেনাদের পৈশাচিকতা আর বাঙালির অবাক প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর দুনিয়ার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যায় বেতার মাধ্যমে। আর তাতে আরো উদ্বুদ্ধ-প্রাণিত হয়েছে রণাঙ্গণের যোদ্ধারা।

প্রতিবেশি দেশ ভারতের সংবাদপত্রের পাশাপাশি বাঙালির মুক্তির আকাঙ্খাকে দারুণভাবে তুলে ধরে আকাশবাণী। এ বেতার কেন্দ্রের দেব দুলাল  বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবদন্তি হয়ে আছেন মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য।

বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া, রেডিও জাপান। বিবিসি হয়ে ওঠে যুদ্ধ সংবাদের নির্ভরযোগ্য ও প্রিয়তম মাধ্যম।

নানা দেশে নানা ভাষায় যুদ্ধ খবর পরিবেশন করেছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস। লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা  নিজ নিজ  অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখেন মুক্তিযুদ্ধে। আনেকেই আবার সরাসরি অংশ নেন যুদ্ধে।

৭০ পেরুনো ফরাসী দার্শনিক আন্দ্রে মালরো খবরের জন্ম দিলেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার ঘোষণা দিয়ে। বিশ্বমিডিয়া এ খবর ফলাও করে তুলে ধরে। সবার নজর তখন বাংলারই দিকে।

নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে সাড়া জাগানো ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’এ কবি-গায়ক জর্জ হ্যারিসন আর বব ডিলানের সঙ্গে  অংশ নেন ভারতের পণ্ডিত রবি শঙ্করও।

অনুষ্ঠানে উঠে আসা অর্থ বাঙালি শিশুদের জন্য পাঠানো হয়। এটি দেখে এগিয়ে আসে মার্কিন নাগরিক সমাজ।

কলিন জ্যাকসনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে  বিচিত্র পেশার ১০ সদস্যের দল-ওমেগা। এর সদস্যরা জীবনের  ঝুঁকি নিয়ে বাঙালি শরণার্থীদের জন্য ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে।

পাকি সরকারের মতিগতি আঁচ করে শুরু থেকেই পেশাগত অনমনীয়তা ও দৃঢ়তার অবস্থান নেয় বিশ্ব মিডিয়া। উদ্যোগী হয় সত্য উদঘাটনে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পরিবেশনে। লন্ডনের গার্ডিয়ান বলতে দ্বিধা করেনি, UNITY CAN NEVER COME THROUGH MURDER  অর্থাৎ, হত্যার মধ্য দিয়ে কখনোই একতা গড়া সম্ভব না।

মার্কিন নীতির কঠোর সমালোচনা করে নিউইয়র্ক টাইমসের ঝাঁঝাঁলো  ‍শিরোনাম-BULLETS OR BREAD! অর্থাৎ  বুলেট না রুটি!

বিশ্ববিবেককে তুমুল নাড়া দেয় এ সব শিরোনাম। দূরদর্শী, বুদ্ধিদীপ্ত ও অর্থপূর্ণ  স্টোরি ছাপা হয়েছিল মার্কিন সাময়িকী নিউজ উইকে। তাতে বলা হয়-PAKISTAN DIES THE DAY THE ARMY ENTERED IN THE EASTERN REGION অর্থাৎ পূর্ববাংলায় ঢোকার দিনেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছে পাকিস্তান।

কি প্রিন্ট, কি ইলেকট্রনিক-সব মাধ্যমই এমনিভাবে মূর্ত করেছে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম। পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের স্বার্থের অঙ্ক উপেক্ষা করে মিডিয়া কথা বলেছে পাকিস্তানের বর্বরতার বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সমাজের এ অবদান বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের অচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে, থাকবে।

এ ঋণ কখনোই শোধ হবার না। সত্যসন্ধানী অবদান সুবাদে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ এসব সাংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিক সমাজ।

এসজেড/কে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়