• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫

দেশে আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা

মাজহার খন্দকার
|  ০৪ জুলাই ২০১৬, ১১:০২
দেশে আইএস আছে, আইএস নেই—এই বিতর্কের মধ্যেই দেশের জঙ্গিরা গুলশানের কূটনৈতিক পল্লিতে রেস্তোরাঁয় আক্রমণ ও জিম্মি, নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে নিজেদের হামলার সামর্থ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জানান দিয়েছে। এ ঘটনা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করলেও এমন পরিস্থিতি আঁচ করা যাচ্ছিল অনেক আগে থেকে।

জঙ্গিদের একটি গোষ্ঠী রাজধানীর কূটনৈতিক পল্লির কাছে একটি টেলিভিশন স্টেশনে ঢুকে জিম্মি সংকট তৈরির পরিকল্পনা করছে বলে চার মাস আগেই জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথ্য পেয়েছিল বলে জানা গেছে। তখন ধরা পড়া কোনো কোনো জঙ্গি জিজ্ঞাসাবাদে এমনও বলেছিল যে তারা ১০-১২ ঘণ্টা জিম্মি সংকট তৈরি করে তাদের অবস্থান জানান দিতে চায়।

কেবল তা-ই নয়, জঙ্গিরা পাঁচ তারকা একটি হোটেলে গাড়িবোমা হামলার পরিকল্পনাও করছিল বলে জানা গেছে। গত ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকায় ওই গোষ্ঠীর একাধিক আস্তানায় হানা দিয়ে পুলিশ গাড়িবোমা হামলার আলামত পেয়েছিল। বিপুল বিস্ফোরকসহ বেশ শক্তিশালী কিছু বোমাও উদ্ধার করা হয়। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ‘তদন্তের স্বার্থে’ এসব তথ্য প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন সময় ব্যক্তিগত আলাপে গাড়িবোমা ঠেকানোর কৃতিত্বের কথা বলেছেন।

এরই মধ্যে দুটি জঙ্গিগোষ্ঠী দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। গত ১৮ মাসে ৬২টি হামলা ও ৭৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৭টিতে আইএস (ইসলামিক স্টেট) ও ৭টিতে একিউআইএস (আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা) দায় স্বীকার করে ইন্টারনেটে তাদের নিজস্ব ফোরামে বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু সরকার শুরু থেকেই বলে আসছে, এ দেশে আইএস বা আল-কায়েদা নেই, এসব দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। যেমনটি করেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০৪ সালে। তখন (এপ্রিল-মে) রাজশাহী-নওগাঁর তিনটি উপজেলায় বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির স্বশাসন কায়েম ও হত্যাযজ্ঞ এবং তারপর গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিও, মাজার, যাত্রা প্যান্ডেল, সিনেমা হলে একের পর এক হামলা হলেও তৎকালীন সরকার জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করেছিল। তখন সরকারের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা বলেছিলেন, এসব বিদেশি ষড়যন্ত্র। বিএনপি সরকারের ওই অস্বীকৃতি বা অবহেলার মাশুল দিতে হয়েছিল দেশবাসীকে। ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা হামলা, তারপর বিভিন্ন আত্মঘাতী বোমা হামলার মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থান জানান দিয়েছিল।

গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশে আইএসের দায় স্বীকারের পর্ব শুরু হয়। এরপর একই কায়দায় ধারাবাহিক হামলা, হত্যা চলে আসছে। গত ১০ মাসে এমন ২৭টি হামলার দায় কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজে স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে আইএস। কিন্তু আমাদের সরকার আইএসের এসব দাবি নাকচ করে দিয়ে, ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রচারে অধিক মনোযোগ দেয়। শুক্রবারের আক্রমণ এখন জঙ্গি দমনের সরকারের সাফল্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মাত্র পাঁচ-ছয়জন তরুণ পাঁচটি ক্ষুদ্রাস্ত্র, হাতে তৈরি বোমা ও ছোরা নিয়ে দেশের সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত কূটনৈতিক পাড়ায় ঢুকে যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তাতে পুরো দেশবাসী স্তম্ভিত হয়েছে। তাদের সামাল দিতে সেনা ও নৌ কমান্ডো এবং সাঁজোয়া যান ব্যবহার করতে হয়েছে। সঙ্গে ছিল র্যা ব, পুলিশ, সোয়াট ও বিজিবি।

২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের পর গুলশানের হত্যাযজ্ঞ দ্বিতীয় বৃহত্তম নৃশংস ঘটনা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। সরকার এখন ‘হোমগ্রোন’ বা জেএমবি, আনসারুল্লাহ যা-ই বলুক না কেন, আইএস দাবিদারেরা অল্প কয়েকজন তরুণকে দিয়েই তাদের সামর্থ্য, নৃশংসতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রমাণ দিয়েছে।

শুক্রবার রাত পৌনে নয়টায় ওই জঙ্গি হামলার পর থেকে আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজ দফায় দফায় ভেতরের খবর দিয়ে আসছিল। সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের ওয়েবসাইট ও টুইটারের কল্যাণে সেটা সবাই দেখেছে। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে আমাক নিউজ তাদের চতুর্থ বার্তায় জানায় যে গুলশানের রেস্তোরাঁর ভেতরে থাকা আইএসের জঙ্গিরা ২৪ জনকে হত্যা করেছে। অবশ্য পরে হিসাব মিলেছে, ২২ জনের (পুলিশের ২ কর্মকর্তাসহ)। এরপর ভোর (শনিবার) সাড়ে ছয়টায় আমাক নিউজ রেস্তোরাঁর ভেতর জবাই করা বেশ কজন জিম্মির ছবি প্রকাশ করে। তখন পর্যন্ত ভেতরের পরিস্থিতি বাইরের কেউ জানে না। এটা পরিষ্কার, আক্রমণকারী জঙ্গিরা ভেতর থেকে তাদের কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছিল এবং ভেতরের ছবি তুলে সেটা পাঠিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিহত জঙ্গিদের ছবি গণমাধ্যমে পাঠানোর আগেই আইএস হামলায় অংশ নেওয়া তাদের পাঁচ সদস্যের ছবি প্রকাশ করে। দেখে বোঝা যায়, আইএসের ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে একটি একে-২২ রাইফেল হাতে পাঁচজনের এসব ছবি তোলা হয়েছিল আরও আগে এবং হামলার পর প্রকাশের জন্য।

শুক্রবারের হামলা যে গত এক বছরে তাদের অন্যান্য হামলার ধারাবাহিকতা, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছে আইএস বাংলাদেশ নিয়ে সর্বশেষ বার্তায়। তাতে তারা গুলশান হত্যাযজ্ঞে তাদের তোলা ছবি দিয়ে একটি পোস্টার তৈরি করেছে। তাতে নিহত বা তাদের পরবর্তী টার্গেটকে ‘ক্রুসেডার’ আখ্যায়িত করে বলেছে, ‘ও ক্রুসেডার, তুমি, তোমার পরিবার ও বন্ধু সবাই আমাদের টার্গেট। আমরা তোমাদের হত্যা করব, এমনকি তোমাদের স্বপ্নকেও।’

এর আগে গত বছর গুলশানে ইতালির নাগরিক ও রংপুরে জাপানি নাগরিককে হত্যা এবং দিনাজপুরে ইতালীয় ধর্মযাজককে হত্যার চেষ্টার পর দায় স্বীকার করে যেসব বার্তা আইএস প্রচার করেছে, তাতে তাদের ‘ক্রুসেডার’ বলে উল্লেখ করেছিল।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার পর বিএনপি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থেকে সরে আসে। এরপর জেএমবির শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

শুক্রবারের হামলার পর গতকাল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, গুলশানের ঘটনা জেএমবি ঘটিয়েছে। এদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে।

অবশ্য এ দেশে জঙ্গিবাদের শুরুই হয়েছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক থেকে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকে আফগান যুদ্ধ শেষে ১৯৯২ সালে এ দেশে প্রথম জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের জন্ম হয়। হরকাতুল জিহাদ মূলত আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক সংগঠন। এর এখানকার প্রতিষ্ঠাতা ও শুরুর দিকের সদস্যরা সবাই আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রশিক্ষিত ছিল। এই হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে পাকিস্তানকেন্দ্রিক হরকাতুল মুজাহিদীন, জয়শ–ই–মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তাইয়েবার যোগাযোগ ছিল।

এরপর ১৯৯৮ সালে জেএমবির জন্ম। এটি সম্পূর্ণ দেশীয় জঙ্গি সংগঠন হলেও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। জেএমবির শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এনজিও আর্থিক সাহায্য দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তিনি একাধিকবার পাকিস্তান গিয়ে কাশ্মীরকেন্দ্রিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক আল-মুহাজেরুন থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন। এসব শায়খ রহমান গ্রেপ্তারের পর জবানবন্দিতে বলেছেন।

লন্ডন পাতালরেলে বোমা হামলায় এক সন্দেহভাজন ২০০৭ সালে সিলেট থেকে আটক হয়। তাকে পরে ওই দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ২০০৯ সালে ইয়েমেনে আল-কায়েদাবিরোধী অভিযানে কয়েকজন বাংলাদেশি ধরা পড়েন। যাঁরা ঢাকার ধনী পরিবারের সন্তান। তাঁরা আনসারুল্লাহ বা এখানকার আনসার আল ইসলামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন দেশ ছেড়েছেন। এঁদের একজনের ভাই রাজীব করিম লন্ডনে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে বোমা পাততে গিয়ে ধরা পড়েছেন। এঁদের নিয়ে প্রথম আলোতে অনুসন্ধানী একাধিক প্রতিবেদন বিভিন্ন সময় ছাপা হয়েছে।

প্রকাশ্যে না বললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপে স্বীকার করেন যে জেএমবির একটি অংশ নতুন নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এসব কর্মকর্তার ধারণা, যেসব বাংলাদেশি সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে, তাদের মাধ্যমে জেএমবির এই অংশটি আইএসের স্বীকৃতি পেয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে ঠিক কতজন সিরিয়া গেছে, তার সঠিক হিসাব জানা না গেলেও ২০ থেকে ২২ জনের একটা হিসাবের কথা শোনা যায়।

জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা যাঁরা পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁদের ধারণা, সরকারের অস্বীকার বা উপেক্ষার সুযোগে গত এক-দেড় বছরে আইএস মতাদর্শের জঙ্গিরা অনেক শিকড় গেড়েছে। এর পরিষ্কার কোনো ধারণা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। যার সাম্প্রতিক প্রমাণ গুলশানের ঘটনা। হামলাকারীরা যে পাঁচ-ছয় মাস আগে থেকে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হলো, সেটা পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করে জানানো সত্ত্বেও পুলিশ আঁচ করতে পারেনি। শুরুতে আঁচ করতে পারলে হয়তো গুলশানের হামলা ঠেকানো যেত। এমন স্লিপার সেলে জঙ্গিদের কত সদস্য আছে, তাদের নেতা কে বা কারা, কোথায় তাদের কমান্ড সেন্টার, এসব বিষয়ে অন্ধকারে সবাই।

এখন আইএস আছে বা আইএস নেই—এ বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত, তাদের মতাদর্শ অনুসরণ করে এমন জঙ্গি সংগঠন এ দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে। এখন বরং তারা আরও নতুন মাত্রায় সক্রিয়, যার সর্বশেষ প্রমাণ গুলশানের ঘটনা। এটা উপেক্ষা করার উপায় নেই।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়