• ঢাকা রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

টাকার কাছে হেরে যাবে ‘একাত্তরের বর্বরতা’!

জুলহাস কবীর
|  ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:১৩ | আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৮:৫৯
পুরো গ্রামজুড়েই এ বিপর্যয়! বিপর্যয় মানবতার, একের পর এক হতভাগার মরদেহ। এ যেন মরদেহ স্তূপ। প্রতীকী এ বর্বরতার দৃশ্য একাত্তরে বাংলার প্রতিটি গ্রামের। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো হত্যাযজ্ঞে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় সারাবাংলা।

নতুন প্রজন্মের সামনে একাত্তরের বর্বরতা, নৃশংসতা, হত্যা ও নির্যাতনের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে চলছে শিল্পী মিন্টু দে’র ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ।

একটি-দু’টি কিংবা আট-দশটি নয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা সম্পর্কে ধারণা দিতে এক হাজার ৭১টি ভাস্কর্য দিয়ে তৈরি হবে ‘একাত্তরের বর্বরতা’ নামে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্যপল্লি। ককশিট বা শোলা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এসব প্রতীকী লাশ। ভাস্কর্যপল্লি জুড়ে থাকবে ২৫০টি ছোট বড় ঘর, ৪টি গণকবর, কাক, কুকুর, শকুনসহ নানা উপকরণ।

গেলো দু’বছর ধরে শিল্পী মিন্টু দে’র সঙ্গে যুক্ত হওয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ১৬ জন শিক্ষার্থীর অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হচ্ছে ‘একাত্তরের বর্বরতা’। অথচ অর্থের অভাবে আটকে আছে ভাস্কর্যপল্লি তৈরির কাজ। 

গেলো ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে এক হাজার ৭১টি ভাস্কর্য দিয়ে তৈরি এ ভাস্কর্যপল্লি প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবার কথা থাকলেও হয়নি তা। প্রায় ৪ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি অর্থের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে না বলে মনে করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পী মিন্টু দে এরইমধ্যে ব্যক্তিগতভাবে এ প্রকল্পে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে শেষ করেছেন ৮শ’ ভাস্কর্যের নির্মাণ কাজ। দরকারি অর্থের সংকুলান না হওয়ায় আজও শেষ হয়নি প্রকল্প। মিন্টু দে’র ব্যক্তি উদ্যোগে শুরু হওয়া প্রকল্পটি সরকারি কিংবা বেসরকারি সহায়তায় দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে বলে মনে করেন তিনি।

কেবল ভাস্কর্য শিল্পী নয়, চিত্রশিল্পী হিসেবেও সুখ্যাতি আছে মিন্টু দে’র। নিজের আঁকা ছবি বিক্রি করে যে টাকা জোগাড় করেছিলেন এতোদিন তার পুরোটাই ব্যয় করেছেন এ কাজে। কেবল নিজের টাকায় নয়, স্ত্রীর পাওয়া পুরস্কারের সব টাকা এরইমধ্যে ব্যয় করেছেন প্রকল্পের খরচ চালাতে। যখনই টাকার অভাবে আটকে গেছে কাজ, তখনই বাবা-মা’র কাছ থেকে এনেছেন টাকা।

শিল্পীর আত্মবিশ্বাস একদিন কেউ না কেউ এ প্রকল্পে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। আর সেদিন আলোর মুখ দেখবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত এ বিশাল কাজ। মিন্টু দে বললেন, ‘এটিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাজ। যেটির ওপর নজর থাকবে সারা বিশ্বের। আশা রাখি মুক্তিযুদ্ধের এ কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে অনেকেই আমার পাশে এগিয়ে আসবেন।’

২০০৭ সাল থেকে যে স্বপ্ন নিয়ে নিজ শহর খুলনার অলিগলি ঘুরেছেন সেই স্বপ্নই ২০১৪ সালে এসে রূপ নিতে শুরু করে বাস্তবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সহযোগিতায় উপচার্যের সরকারি বাসভবনে ভেতরে শুরু হয় ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। মিন্টু দে বললেন, ‘স্যার (আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক) সেদিন আমার এ স্বপ্নকে যদি আমার মতো করে না ভাবতেন তাহলে আজ এ পর্যায়ে আসা সম্ভব হতো না। তিনি নিজের বাসভবনে আমাকে এ কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন যা সত্যি আমার জন্য বিরাট এক পাওয়া। সহযোগিতা করছেন এটির প্রদর্শনীর জন্যও।’

তবে যে মানুষটির নিঃস্বার্থ সহযোগিতায় পুরো প্রকল্পটি এতোদূর এসেছে, হতাশা এতোটুকুও গ্রাস করতে পারেনি তাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ. আ. ম. স. আরেফিন সিদ্দিক বললেন, ‘এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে মুক্তিরযুদ্ধের ইতিহাস পৌঁছে দিতে মিন্টু দে’র এ কাজ হবে অন্যতম এক মাধ্যম। আশা করি সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় এ প্রকল্প খুব দ্রুতই সাধারণের জন্য প্রদর্শনী হবে।’ সমাজের বিত্তবানরা এ কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন বলেও মনে করেন উপাচার্য।

হঠাৎই বন্ধ হতে বসা এ কাজটি দ্রুত শেষ করে প্রদর্শনীর জন্য প্রস্তত করতে শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন তাদের একজন। তিনি বললেন, ‘মিন্টুর এ কাজ মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মাণ করা সবচেয়ে বড় কাজ। যা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা দেবে’। এ প্রকল্পে সব ধরনের সহযোগিতাও করবেন বলেও জানালেন আরিফ হোসেন।

শিল্পীর এ উদ্যোগের প্রশংসা করলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আর্থিক কোনো সহযোগিতা করা সম্ভব নয় বলে জানান মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

একাত্তরের ভয়াবহতা আর বাংলার গৌরবোজ্জল ইতিহাস এ ভাস্কর্যপল্লির মধ্যদিয়েই ছড়িয়ে পড়বে তরুণ প্রজন্মের কাছে। একাত্তরের পরবর্তী প্রজন্ম-যারা কেবল মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেই ‘একাত্তরের বর্বরতা’ নির্মাণ করছেন তাদের চোখে মুখে এখন একটাই স্বপ্ন, এটি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে আলোর মুখ দেখবে। এ প্রকল্প কেবল বাংলাদেশে নয়, জায়গা করবে বিশ্ব ইতিহাসেও।



এইচটি/এসএস/এম

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়