• ঢাকা বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫

অবহেলায় পড়ে আছে ধাপ-ঢুপ বধ্যভূমি

রাজিউর রহমান রাজু, পঞ্চগড়
|  ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০:১০ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০:৫৭
‘দাঁড়াও পথিকবর,

জন্ম যদি তব বঙ্গে !

তিষ্ঠ ক্ষণকাল !

এ সমাধি স্থলে.......’

ভিত্তি ফলকটিতে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই বিখ্যাত উক্তিটি লেখা থাকলেও আজো কোনো পথিককে এই জায়গাটিতে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ না হওয়ায় এখনো অজনাই রয়ে গেছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চগড় জেলার সবচেয়ে বড় এই বধ্যভূমির ইতিহাস। সেই সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করেছে ফলকে লেখা এই পঙক্তিটিও।

১৯৭১ এর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি কোনো শুক্রবারে হাজারো মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল জেলার বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিনের ইসলামপুর এলাকার ধাপ-ঢুপ বিলের পানি।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম অত্যাচার থেকে বাঁচার তাগিদে ভারতে যাওয়া প্রায় সাড়ে ৩ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী পুরুষকে দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় হত্যা করে ধাপ-ঢুপ বিলে ফেলে দিয়েছিল হানাদাররা।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এই ভয়াল স্মৃতিকে ধরে রাখতে ধাপ-ঢুপ বিলের পাড়ে ২০১১ সালে পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিকের পরিকল্পানায় জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলেও আজো বাস্তবায়িত হয়নি।

ওই এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পঞ্চগড় জেলার সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল পাঁচপীর ইউনিয়নের এই ধাপ-ঢুপ বিলের পাড়ে। পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার সইতে না পেরে ইসলামপুর গ্রামের ধাপ-ঢুপ বিল সংলগ্ন আম বাগানে এসে সমবেত হয়েছিল শুকানপুকুরী, জাঠিভাঙ্গা, পাঁচপীর, জগন্নাথপুর, সালন্দর ও শিবকাঠি এলাকার কয়েক হাজার সংখ্যালঘু পরিবার ও অন্যান্য এলাকা থেকে পালিয়ে আসা তাদের আত্মীয়-স্বজনরা।

চারিদিকে গোলা-গুলি আর হত্যাযজ্ঞের কারণে ওরা প্রাণ ভয়ে ঘরবাড়ি ফেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে ওই জায়গায় সমবেত হয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। পরিকল্পনা ছিল ওই পথে ভারতে পাড়ি জমাবার।

বিশ্রামের এক পর্যায়ে রাজাকারদের দেয়া খবরে হঠাৎ চলে আসে পাকিস্তানি সেনাদের কয়েকটি ট্রাক। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে সকল নারী-পুরষদের। শুরুতেই নারীদের আলাদা করে নেয় তারা। কিছু কিছু নারীর ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। পরে পুরুষদের নিয়ে আসা হয় ধাপ-ঢুপ বিলের পাড়ে। শুরু হয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আর গুলি করে হত্যাকাণ্ড। একে একে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পুরুষকে হত্যা করে ফেলে দেয়া হয় ধাপ-ঢুপ বিলে। রক্তে লাল হয়ে যায় বিলের পানি।

সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে উঠেন মরদেহ’র স্তুপে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা শুকানপুকুরী এলাকার ২৪/২৫ বছরের যুবক সপেন্দ্র নাথ রায়। ডান বাহুতে গুলি আর কাঁধে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অজ্ঞান হয়ে লাশের স্তুপে পড়ে থাকায় ঘাতকরা মনে করেছিল তিনিও মারা গেছেন । হত্যাকান্ডের প্রায় ঘন্টা খানেক পর সপেন্দ্র নাথের জ্ঞান ফিরে এলে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় পালিয়ে যান ভারতে। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন সপেন্দ্র নাথ।

শরীরে সেই ক্ষত নিয়ে আজো বেঁচে থাকা সপেন্দ্র নাথ রায় জানান, তার সঙ্গে সেদিন ক্ষেত্র মোহন, থেপু বর্মন, শীতেন চন্দ্র, মলিন চন্দ্র নামের আরও ৪ জন বেঁচে গেলেও তারা আর বেশিদিন বাঁচেননি।

দুঃসহ সেই স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সপেন্দ্র নাথ। তিনি বলেন, এই গ্রামে কোনো পুরুষ ছিল না। সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছিল সেদিন। শুধু নারীরা আর তাদের কোলে থাকা শিশুরা বেঁচে ছিল। শ’ শ’ নারী সেদিন বিধবা হওয়ায় শুকানপুকুরী গ্রামটিকে মানুষ বিধবা পল্লী হিসেবে জানত বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, গন্ডোগোলের সময়কার (মুক্তিযুদ্ধের) এই স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখানে নাকি স্মৃতিসৌধ হবে, কই আজো তো এই কথার বাস্তবায়ন দেখলাম না। শুধু স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস ছাড়া তাদের খোঁজ কেউ রাখে না বলে অভিমানের সুরে বলেন তিনি ।

পাকিস্তানি সেনাদের হাতে স্বামী খুন হবার প্রত্যক্ষদর্শী বিধবা পল্লীর অন্তবালা জানান, আমিও সেদিন ছোট ছোট ৩ মেয়ে আর ২ ছেলেকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ধাপ-ঢুপ বিলের পাড়ে আম বাগানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। চোখের সামনে আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে হত্যা করে মিলিটারীরা। সারা জীবন অনেক কষ্ট করে ৫ ছেলে-মেয়েকে মানুষ করেছি। তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। বছর খানেক আগে একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড পাইছি।

এমনিভাবে স্বামী হারানোর বেদনা আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন ওই এলাকার সৌদামুনি, অনকছড়িসহ আরো শ’ শ’ বিধবা।

শুকানপুকুরী এলাকার ভূষন চন্দ্র রায় জানান, মায়ের কাছে শুনেছি সেদিন আমি অনেক ছোট থাকায় মায়ের কোলে ছিলাম। হানাদাররা আমার বাবাসহ আমাদের পরিবারের ৭ জনকে হত্যা করেছিল। কিন্তু আজো স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এই জায়গার সংস্কার হয়নি। কয়েক বছর আগে ছোট একটা ভিত্তিফলক স্থাপন হবার কথা ছিল। শুনেছিলাম এখানে একটি স্মৃতিসৌধ হবে কিন্তু তার বাস্তবায়ন আমরা আজো দেখিনি।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পঞ্চগড় ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার মির্জা আবুল কালাম দুলাল বলেন, ধাপ-ঢুপ বধ্যভূমিতে স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ দিনগুলোতে পূষ্পস্তবক অর্পণ করলে সেই সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা করলে সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে প্রচার-প্রসার হবে। তবে সংস্কার করে ওই বধ্যভূমির ইতিহাস সবার কাছে তুলে ধরার দাবি জানান তিনিও।

 

কে/এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়