• ঢাকা বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫

রাইফেলের মতো কণ্ঠও ছিলো হাতিয়ার

আজিজুর রহমান পায়েল
|  ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৮:৩৮ | আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩:৫৬
‘যুদ্ধ এবার যুদ্ধ

শুনরে হানাদার দুর্বৃত্ত

পালাবার পথ রুদ্ধ

যুদ্ধ এবার যুদ্ধ’

কণ্ঠে রণসঙ্গীত আর হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল।দুটোই ছিলো মুক্তির হাতিয়ার। অস্ত্রে যেমন শাণ দিয়েছি, সেই সঙ্গে মুক্তিসেনাদের প্রেরণা যোগাতে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান করেছি।মুক্তিকামী মানুষ তথা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোরঞ্জনের পাশাপাশি তাদেরকে উজ্জীবিত করতে আমাদের গাওয়া গান সেসময় টনিকের মতো কাজ করেছে। শত শত ছাত্র-যুবক, কৃষক, শ্রমিকসহ খেটে খাওয়া মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার কথা এভাবেই জানালেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দক্ষিণ পৈরতলা এলাকার মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে নিভৃতচারি মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধ সংগঠক, কণ্ঠযোদ্ধা ফিরোজ আহমেদ।

মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চাইলে ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমার মুক্তিযুদ্ধ শুরু সেই ছোট বেলাতেই। আমাদের বাড়ির এক লজিং মাস্টারের কাছে তখন বাল্যশিক্ষা বই পড়তাম। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পুলিশে যোগ দিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন। সেসময় গুলিতে মারা গিয়েছিলেন তিনি। এটা শোনার পর থেকেই মনে একটা দাগ লাগে। তখন থেকেই আমি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকি। এরপর স্কুলে পড়াকালীন গণসঙ্গীত চর্চা করতাম। সেসময় মাওলানা ভাসানির সন্তোষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে ‘দুনিয়ার মজদুর ভাইসবে, আয় এক মিছিলে’ গণসঙ্গীত গেয়েছিলাম। পরে ভাসানি আমার পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়েছিলেন। এরপর ১১ দফা, ছয় দফা, ৬৯-র গণআন্দোলন, ৭০-র নির্বাচন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তির গান গেয়েছি। আজ অবধি সে গান গেয়েই যাচ্ছি।

১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং তিন নম্বর সেক্টরের গেরিলা উপদেষ্টা প্রয়াত সংসদ সদস্য লুৎফুল হাই সাচ্চু’র সান্নিধ্যে যুদ্ধে গিয়েছি। তিন নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছি।সেসময় দেশের পূর্ব রণাঙ্গনে (২ ও ৩ নম্বর সেক্টর) মুক্তির গান গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করতাম আমরা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি বলে পাকি বাহিনী আমাদের বাড়িঘর ও দোকান পুড়িয়ে দেয়।

তিনি জানান, যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন পরই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ঘাটুরা এলাকায় অধ্যাপক হারুনুর রশীদ ও আখাউড়ার ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমেদ ও ইসমাইল হোসেনকে নিয়ে স্থাপন করেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা প্রশাসক কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ (বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার)বেতার কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেছিলেন। অধ্যাপক হারুণ ওই কেন্দ্রে গান রেকর্ড করে প্রচারের পাশাপাশি উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখতেন। ওই কেন্দ্র স্থাপনের তিন দিন পরই পাকি বাহিনী বিমান হামলা করে কেন্দ্রটি গুড়িয়ে দেয়। এ হামলায় কয়েকজন প্রাণ হারান। এরপরই তারা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে যান।

ফিরোজ আহমেদের জবানিতে জানা যায়, ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তান সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। ওই ঘোষণায় বলা হয়, যারা যুদ্ধের জন্য ওপারে (ভারতের ত্রিপুরা) গেছে তারা দেশে এলে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। এ ঘোষণার পর বিভিন্ন ইয়্যুথ ক্যাম্পের যুবকদের তখন মনোবল ভেঙ্গে যায়। সে সময় পাকিস্তান সরকারের সাধারণ ক্ষমার আহবানে সাড়া দিয়ে অনেকেই দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকি বাহিনী।

এরপর আগস্ট মাসের দিকে সে সময়কার ছাত্রনেতা (পরে জাতীয় বীর খেতাবপ্রাপ্ত) আব্দুল কুদ্দুছ মাখন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য এবং জনমনে চেতনা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কণ্ঠযোদ্ধা ফিরোজ আহমেদকে আগরতলায় একটা সাস্কৃতিক টিম গঠন করার কথা বলেন।পরে ছাত্রনেতা মাখন ও শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংস্থা’ নামে একটি টিম গঠন করা হয়। বাংলাদেশ থেকে যে সব শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের নিয়েই প্রথমে এ সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়। ওই সাংস্কৃতিক দলটি পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে কণ্ঠশিল্পী ফিরোজ আহমেদের ওপর। আখাউড়ার গঙ্গাসাগরের নৃত্যশিল্পী আজিজুল্লাহ চকলেট এ টিমের আহ্বায়ক ছিলেন। এরপর মুক্তিসেনাদের পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন ক্যাম্প, যুবশিবির এবং শরনার্থী শিবিরে গিয়ে তারা উদ্দীপনামূলক সঙ্গীত, নাটক ও নৃত্য পরিবেশন করতেন।

পুর্ব রণাঙ্গনের এ সাংস্কৃতিক টিমের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সঙ্গীত রচনা ও সুর করতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রয়াত একেএম হারুনুর রশীদ ও গীতিকার জীবন বর্মণ। শিল্পীরা তাদের লেখা গান গেয়েছেন।

৫১ সদস্যের এ সংগঠনে যেসব সঙ্গীত, নাটক ও নৃত্যশিল্পী জড়িত ছিলেন তারা হলেন- দিলারা হারুন (পরবর্তীতে সংসদ সদস্য), বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী অজিত রায়, ওস্তাদ উমেশ চন্দ্র রায়, রেজা মজিদ, সরদার আলাউদ্দিন, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী, কামাল আহমেদ, মৃণাল কান্তি দত্ত, হরি প্রসন্ন পাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দক্ষিণ মৌড়াইল এলাকার দেলোয়ার জাহান ঝন্টু (পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালক), আখাউড়ার সৈয়দ মামুনুর রশীদ, মেড্ডা এলাকার সুমিত্রা ভট্টাচার্য, মৌলভীপাড়ার ছবি পাল, রুবি পাল, কাজীপাড়ার ছায়া রায়, বণিক পাড়ার বেনু চক্রবর্তী, কুমিল্লার দু’ বোন গীতশ্রী চৌধুরী ও জয়শ্রী চৌধুরী, সিথি কর ও মুন্সীগঞ্জের শাহাবুদ্দিন।

ফিরোজ আহমেদ জানান, আগরতলায় গঠিত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংস্থা বিভিন্ন এলাকায় এবং ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করতো বলে অনেকে একে ‘ভ্রাম্যমান শিল্পী সংস্থা’ বলতেন। কেউ কেউ বলতেন ‘জয় বাংলা সাংস্কৃতিক সংস্থা’। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাশাপাশি ত্রিপুরার শিল্পীরাও এগিয়ে এসেছিলেন।বাংলাদেশের কণ্ঠে তারাও কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন।

সে সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, এখনো কানে বাজে সে সুর-‘কারার ঐ লৌহকপাট/ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট/রক্ত জমাট, শিকল পূজার পাষাণ-বেদী’। ‘চেয়ে দেখ পুব আকাশ লালে লাল হয়ে আছে/সব শহীদের রক্ত জমে সূর্য হয়ে গেছে’। ‘লাল লাল রক্তে ভেসে গেছে জনপদ/কত যে মায়ের কোল শুন্য করেছে নির্মম পিশাচের দল’। ‘বহ্নিশিখা জ্বালাও লাঞ্চিত জনতা/তীব্র আঘাত হানো, দুর্বার বেগে চলো’। ‘মুজিব ভাই আসিয়া/সোনার বাংলা যাও দেখিয়া/সোনার বাংলা করলো শশ্মান রে/পাঞ্জাবি বর্বর ইয়াহিয়া/মেশিন গান আর বুলেট গুলি দিয়া’।

মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনানোর সময় ফিরোজ আহমেদ বলেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ বিকেলে আমরা ক’বন্ধু মিলে ছাত্রনেতা শহীদুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের পুরান হোস্টেলে আড্ডা দিচ্ছিলাম। ট্রানজিস্টারে ঢাকার খবর শুনতে চাইলাম। কিন্তু ঢাকা ধরছে না বলে আমরা ষ্টেশন ঘুরিয়ে কলকাতা ধরতেই শুনলাম ঢাকায় হামলায় খবর। এরপর আমরা অনেক ছেলে একসঙ্গে জড়ো হয়ে ভাবতে লাগলাম, কী করা যায়। এরপর নেতারা জানলো।একে একে সবাই জানলো। মুক্তিযুদ্ধকালীন তিন নম্বর সেক্টরের গেরিলা উপদেষ্টা লুৎফুল হাই সাচ্চু’র নেতৃত্বে শুরু হলো আমাদের প্রতিবাদ। তখন রাইফেল নেই, আমার হাতে ছিল একটা বল্লম। এ বল্লম নিয়ে পৈরতলা থেকে আমরা তিনজন পাঞ্জাবি মারতে শহরের দিকে রওনা হলাম। সে সময়কার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (নবীনগর এলাকার) আহাম্মদ আলী পাঁচ/ছয় হাজার লোকের একটি মিছিল নিয়ে আসেন। সবার হাতেই ছিল দা, বল্লম আর তীর। তখন আমরা খবর পেলাম কুমিল্লা থেকে পাক সেনাদের একটি বহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দিকে আসছে। ওই পাক সেনাদের আক্রমণ করতে আহাম্মদ আলী ভাইসহ আমরা রেললাইন ধরে পুনিয়াউটের দিকে যাচ্ছিলাম। আমরা নয়নপুর মোড়ে যাওয়ার আগেই শুনতে পাই আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাক সেনাদের মেরে ফেলে। পরে অবশ্য চিন্তা করেছি- যেভাবে দা-বল্লম নিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম, যদি পাকি সেনারা আমাদেরকে ব্রাশ ফায়ার করতো, কী অবস্থা হতো!

রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফিরোজ আহমেদ বলেন, এমনই ছিলো আমাদের চেতনা। আর চেতনাই ছিলো সবচে’ বড় শক্তি। এখানে দা-বল্লম দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা যাবে কি না, ভাবার ফুরসত ছিল না কারোই।

যুদ্ধের গল্প বলতে বলতে আক্ষেপের সুরও ভেসে ওঠে ফিরোজ আহমেদের কণ্ঠে। বলেন, পঁচাত্তর পরবর্তী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাওয়ার জন্য আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। মাথায় হুলিয়া নিয়েই গেয়েছি-‘মুজিব তোমার হত্যার বিচার হবে/আমরা তো আজ তৈরি সবে/দিকে দিকে জাগে ওই দৃপ্ত শপথ/মিছিলে মিছিলে মুখরিত রাজপথ’।

জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবি সমিতি ভবনে এ গান গাওয়ার পর আমার বাড়িতে পুলিশ আসে। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার আমলে শিল্পকলার প্রশিক্ষক পদ থেকে আমাকে বাদ দেয়া হয়। সেই থেকে আজ অবধি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কোথাও ঠাঁই হয়নি নিবেদিত প্রাণ, ত্যাগী এই বঙ্গবন্ধুপ্রেমীর।  

যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এ বিচার তো আরো আগেই করা উচিত ছিল। এটা আমাদের বহু আগের দাবি। গানে গানে আমরা এ দাবি করে গেছি- ‘দেখছো নি ভাই কি কারবার/পাঞ্জাবি আর রাজাকারে/দেশ করলো ছারখার’।

ফিরোজ আহমেদ ও ফেরদৌসী আহমেদ দম্পতির চার মেয়ে। বড় মেয়ে নাজমীন আহমেদ অ্যানি ও নাজরীন আহমেদ প্রমিকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দু’জন ইসরাত আমেদ উর্মি স্নাতক ও আফরিন আহমেদ তনু নবম শ্রেণিতে পড়ছেন।

সরকারের কাছে ব্যক্তিগত কোন প্রত্যাশা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিজীবনে আমি চার কন্যা সন্তানের জনক। আমি কোন সাহায্য চাই না। আমি শুধু সম্মান ও ভালোবাসা চাই। তিনি প্রশ্ন রাখেন-১৯৭২ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন দুইশ’ শিল্পী নিয়ে আমি গান গেয়েছি। তবে আজ কেন আমি অবহেলিত? বলেন, এই দেশটার জন্য আমাদের বীরেরা রক্ত দিয়েছে। এ দেশের সাধারণ মানুষগুলো সুখে থাকলে সেসব শহীদদের আত্মাও শান্তি পাবে। এজন্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যেন কাজ করে যায় সরকার-এমনটাই চাওয়া এ বীরযোদ্ধার।

এসজেড

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়