• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫

দেবিদ্বারের ৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা

এতোদিনেও হলো না সমাধি সংরক্ষণ!

আবুল খায়ের, কুমিল্লা উত্তর প্রতিনিধি
|  ০১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২:০১ | আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৬, ১০:০২
১৯৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ৪৫ বছর কেটে গেছে। এরইমধ্যে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার ভাতা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও চরমভাবে অবহেলিত কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার বারুর গ্রামের ৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার।

অনেক দৌড়ঝাঁপ করেও জীবন উৎসর্গকারী ওই ৭ বীর সন্তানের কবর পাকা করার সামান্য অর্থ সহায়তা প্রশাসনের কাছ থেকে এখনো পায়নি স্বজনরা।

এদিকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের নাম থাকলেও সরকারি নীতিমালা অনুসারে ‘ওয়ারিশ’ নীতির গ্যাড়াকলে পড়ে ওই ৭ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মধ্যে ৫ পরিবার বর্তমানে সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। ৫ জনই অবিবাহিত হওয়ায় সরকারি নীতিমালা অনুসারে তাদের ওয়ারিশ নেই অজুহাত দেখিয়ে পরিবারের বাকি অসহায় সদস্যরা বর্তমানে কোন সহায়তা পাচ্ছে না।এ অভিযোগ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের।

যুদ্ধ চলাকালে দেশকে পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বারুর গ্রামের তরুণ যুবক বাচ্চু মিয়া, শহীদুল ইসলাম, মোহাম্মদ হোসেন, জয়নাল আবেদীন, সফিকুল ইসলাম, আলী মিয়া ও সামাদ মোল্লা ভারতের পালাটোনা ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে তারা দেবিদ্বার উপজেলার বারুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন।

এক গ্রামের একদল তরুণ বীর মুক্তিযোদ্ধার দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গের খবর তখন বেতারসহ সংবাদ মাধ্যমে ফলাও প্রচার হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শাহাদাৎ বরণ করায় মহান এ আত্মত্যাগের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের পরিবারের খোঁজ খবর নেন। ১৯৭২ সালের ১৫ জুন বঙ্গবন্ধুর সইকরা একটি চিঠির মাধ্যমে স্বজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোসহ কয়েক বছর শহীদ পরিবারের জন্য সন্মানিভাতার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু জাতির জনকের শাহাদাৎ বরণের পর ওই সব পরিবারের খোঁজ আর কেউ নেয়নি।

এ বিষয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু মিয়ার ছোট ভাই শাহ আলম জানায়, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বছরে ২ হাজার টাকা করে কয়েক বছর আমাদের পরিবারের জন্য সম্মানিভাতা পাঠিয়ে ও পত্র লিখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শাহাদাৎ বরণ করার পর আমি আমার ভাইয়ের কবরটি পাকা করার জন্য এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করি।কিন্তু কোন সাড়া পাইনি।’

শহীদ আবুল হোসেনের ভাই আবুল কাশেম জানান, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ না হলে আমার ভাই সংসারের হাল ধরতেন, কিন্তু দেশে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার নিয়ে এ কেমন আইন, সহোদর ভাই হারিয়েও আমরা কেন সরকারি সহায়তা পাবো না?’ 

তিনি আরো বলেন, ভাইয়ের স্মৃতি রক্ষার জন্য এখনো সকলের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি, গরিব ও অসহায় বলে আমাদেরকে কেউ মূল্যায়ন করে না। প্রতি বছরই স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস আসে-যায়, কিন্তু আমাদের পরিবারের সদস্যদেরকে কেউ ডাকে না, আমাদের খোঁজ খবর কেউ রাখে না।

তবে আশার কথা হচ্ছে, দেবিদ্বার উপজেলা সদরের নিউ মার্কেট মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি চত্বরে বারুর গ্রামের ওই ৭ বীর শহীদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সামাদ জানান, দেবিদ্বারের ৪৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম সরকারি গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বারুর গ্রামের ৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামও রয়েছে।তারা প্রকৃত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তাদের কবর পাকা করতে সহয়তা করা হবে। আর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সরকারি নীতিমালার কারণে ওই ৫ পরিবার সরকারি কোন সহায়তা পাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, বারুর গ্রামের ৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের সরকারি সহায়তা বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসএস/এসজেড

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়