আজ যেসব জেলা হানাদার মুক্ত হয়

প্রকাশ | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:০০ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:১১

আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা (বর্তমানে মুজিবনগর) আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করে। আর এর মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা যুদ্ধে নতুন মাত্রা পায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নব গঠিত বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন দিতে থাকে। এতেই জ্বলে ওঠে পাক হানাদার বাহিনী। এ অঞ্চলের মানুষকে প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে পাক সেনারা। অসংখ্য মানুষকে নির্বিচারে হত্যা ও গুম করে তারা। তবে বেশিদিন তা টেকেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে পিছু হটে পাক সেনারা। ৬ ডিসেম্বর, আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ে মেহেরপুরের আকাশে। 

মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে ৫ ডিসেম্বর মেহেরপুরে প্রবেশ করে। ১ ডিসেম্বর মেহেরপুর মুক্ত হলেও সীমান্তে পাকবাহিনীর পুঁতে রাখা অসংখ্য স্থলমাইন অপসারণের মধ্য দিয়ে মেহেরপুর পুরোপুরিভাবে হানাদার মুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর।

মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধরে রাখতে গড়ে উঠেছে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। যেখানে গেলে ভেসে উঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। 

কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত দিবস 

৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ৬ নং সেক্টরের সাব-কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের হটিয়ে কুড়িগ্রামকে মুক্ত করে। ওই সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও কুড়িগ্রামে সেদিন উদিত হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।
সেই থেকে ৬ ডিসেম্বরকে কুড়িগ্রাম জেলাবাসী ‘কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করছে। 
এবারও কুড়িগ্রাম হানাদার মুক্ত দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে এখানকার মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো দিনব্যাপী নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৬ ও ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল গোটা কুড়িগ্রাম অঞ্চল। ৬ নং সেক্টরের সাব-কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের শক্ত ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে। এতে শত্রু মুক্ত হয় ভুরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, চিলমারী, উলিপুরসহ বিভিন্ন এলাকা।

ফেনী মুক্ত দিবস
বুধবার ৬ ডিসেম্বর। ফেনী পাক হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১’র এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ছিল। 

ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে কর্মরত তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম ভারতের বিলোনীয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযানে বিলোনিয়া, পরশুরাম, মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, যুদ্ধ করতে করতে এগুতে থাকে। পর্যদুস্ত হয়ে ফেনীর পাক হানাদার বাহিনীর একটি অংশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তায় অপর অংশ শুভপুর ব্রিজের উপর দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়।

অপরদিকে বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর ফেনী মহাকুমা কমান্ডার অধ্যাপক জয়নাল আবদীনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দাগনভূঞা, রাজাপুর, সিন্দুরপুর হয়ে শহরের দিকে এগুতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাক হানাদাররা ৬ ডিসেম্বর রাতে কুমিল্লার দিকে পালিয়ে পায়। 

দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনে জেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। এদিন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান করা হবে।

সুনামগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয় আজ

সুনামগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয় আজ। এ দিনকে সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসেবে জেলার মুক্তিকামী জনতা অবিহিত করেছেন। সেই থেকে প্রতি বছর ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ দিবসটি উপলক্ষে সুনামগঞ্জে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

সুনামগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করতে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বনগাঁও মুক্তিযোদ্ধাদের কোম্পানি হেডকোয়াটারে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের এই দিন সুনামগঞ্জ মহকুমায় মুক্তিযোদ্ধারা সুনামগঞ্জ শহরকে পাক হানাদার মুক্ত করেন। হানাদার বাহিনীর পতনের পর এ এলাকার সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে মুক্তির উল্লাস। আনন্দ উদ্বেলিত কণ্ঠে ‘জয়বাংলা ধ্বনি’ আর হাতে প্রিয় স্বদেশের পতাকা নিয়ে ছুটাছুটি করতে থাকে তরুণ-যুবক সবাই।

লালমনিরহাট হানাদার মুক্ত দিবস

আজ লালমনিরহাট পাক হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে লালমনিরহাট হানাদার মুক্ত হয়। ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও বীরমুক্তিযোদ্ধারা লালমনিরহাট শহরকে পাক হানাদার মুক্ত করতে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ পরিচালনা করে। মিত্রবাহিনী ও বীরমুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশন থেকে পাক হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আলবদর, আলসাম্স ও তাদের দোসর অবাঙ্গালীরা দুটি স্পেশাল ট্রেনযোগে রংপুর ও সৈয়দপুরে পালিয়ে যায়। লালমনিরহাট জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয়।

এর আগে ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লালমনিরহাট রেলওয়ে রিকশাস্ট্যান্ডে পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের চক্রান্তে গণহত্যা চালানো হয়। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী, বুদ্ধিজীবীসহ ৩৭৩জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। পরে গণহত্যায় নিহত লোকদের রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশে একটি ডোবায় ফেলে দেয়া হয়। বর্তমানে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি গণকবর।

এদিকে হানাদার মুক্ত দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারিভাবে পালিত হবে নানা কর্মসূচি। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এসএস