• ঢাকা শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫

নৌকা-অর্থ সংকটে সাঁতরে আসছে রোহিঙ্গারা

শাহীন শাহ, টেকনাফ (কক্সবাজার)
|  ০৯ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:৫১ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৭, ২০:০৯
নৌকা ও অর্থ সংকটের কারণে ঝুঁকি নিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। এদের কেউ সাঁতরে, কেউ প্লাস্টিকের জার, কেউ বাঁশের তৈরি ভেলায় করে বাংলাদেশে আসছেন। 

৯ নভেম্বর বিকেলে ভেলায় করে ১৩২ জন রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশু এপারে এসেছেন। তাঁদের উদ্ধার করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাঠিয়েছে প্রশাসন। 

এছাড়া টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বিভিন্ন পয়েন্টসহ মহেশখালীপাড়া, পশ্চিম সৈকত, নাইট্যংপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ১ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ঢুকেছে। 

টেকনাফ থানার এসআই অনিমেশ মন্ডল জানিয়েছেন তিনি ৭ শতাধিক রোহিঙ্গাকে তালিকাভুক্ত করেছেন। তাঁদের অস্থায়ী ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য রাখাইন থেকে পালিয়ে আসতে গিয়ে সীমান্তের কাঁটাতার পার হয়ে নাফনদের বালুচরে অবস্থান করছেন রোহিঙ্গারা। 

সেখানে নৌকা না পাওয়ায় এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত প্রায় ৮-১০ হাজার রোহিঙ্গা আটকা পড়ে আছে। 

প্রতিদিন নৌকায় করে অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা এপারে আসছে। একটি সংস্থা সেই ধংখালী বালুচরে খাদ্য সরবরাহ করলেও জ্বালানি, পানি ও প্রয়োজনীয় কাজে পুনরায় কাঁটাতার পার হয়ে অভ্যন্তরে ঢুকলেই মগ সেনাদের অমানবিক নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। 

কোনোভাবে তাদের আর গ্রামে ফিরে যেতে দিচ্ছেনা। ওই স্থানে চাঁদ ও প্লাস চিহ্ন একটি সংস্থা (তাঁদের ভাষায় আপ্পুই) শুকনা খাবার ও পানি দিলেও চরম চিকিৎসার অভাব রয়েছে। 

সেনারা সকল রোহিঙ্গা পরিবারের গ্রুপ ছবি তুলে তালিকাভুক্ত করছে। অনেক পুরুষকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। 

চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে অনেকের। বুছিডংয়ের পেরুল্লা পাড়া, হরমুড়া পাড়া, কেতুর পাড়া, ছাম্মা পাড়া, ছিন্দিপ্রাং, দুইধং, ওয়ামইগ্যা, ওয়ারিঅং, পুঁইমালি পাড়াসহ একাধিক পাড়া হতে এসব রোহিঙ্গারা সীমান্তের ধংখালী বালুচরে নৌকার অপেক্ষায় আছে। এসব তথ্য জানিয়েছেন এপারে আসা রোহিঙ্গারা। 

মিয়ানমার রাখাইনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বেশীরভাগ মংডুর ধংখালী নাফ নদ সীমান্তের বালুচরে জড়ো হয়। 

সেখানে বাংলাদেশি কোনো নৌকা পৌঁছলেই এপারে আসতে সক্ষম হচ্ছে রোহিঙ্গারা। এখনো সেখানে ৮-১০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সেই ধংখালী বালুচর থেকে ৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ভেলায় ভেসে ১৩২ জনসহ নৌকায় করে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ঢুকেছে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশু। 

বুধবার সকালেও প্লাস্টিকের জার ও বাঁশের ভেলায় ভেসে ৫২ জন রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশু ঝুঁকি নিয়ে এপারে এসেছিল। 

যাদের নৌকা ভাড়ার টাকা নেই তারা এ পন্থায় ঝুঁকি নিয়ে এভাবে ভেলায় ভেসে আসছে বলে রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন। 

এপারে আসা রোহিঙ্গা নারী বুছিংডংয়ের ওয়ারিঅং এলাকার মোঃ ছিদ্দিকের স্ত্রী রেহেনা বেগম (৪০) জানান, গত দেড় মাস ধরে ধংখালী বালুচরে অপেক্ষা করেছি নৌকার জন্য। 

রাখাইনে কোথাও কাজ নেই, ঘর থেকে বের হওয়া যায়না, বাজারও নেই, ঘরে খাদ্য নেই, চাষের ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে সেনারা। পাহাড়ে কিংবা নদীতে গেলে আটক করা হচ্ছে। খাদ্য ও চিকিৎসার চরম সংকটে অর্ধাহারে অনাহারে থাকায় ক্ষুদার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে গ্রামের রোহিঙ্গারা দলে দলে এপারে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটছে। 

এ অবস্থায় পরিবারের ১৩ জনকে নিয়ে এপারে এসেছি। 

নুরুল ইসলাম জানান, পরিবারের ১৬ জনকে নিয়ে ২৮ দিন পর্যন্ত বালুচরে থেকেছি। এপার থেকে মাঝে মাঝে দুয়েকটি নৌকা গেলেও তাতে উপচেপড়া ভিড়ে উঠা সম্ভব হতো না। অবশেষে বুধবার রাতে জনপ্রতি ৭০ হাজার কিয়াতের বিনিময়ে এপারে এসেছি। 

তিনি আরো জানান, কাঁটাতারের ঘেরা পার হলেই আমাদের আর ভিতরে ঢুকতে দিতোনা সেনারা। সেখানে তার চোখের সামনে কাঁটাতার পার হওয়ার কারণে ৪ জন যুবককে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছে। লাঠি দিয়ে মেরে সারা শরীর থেঁতলে ফেলেছে।

অনেক গর্ভবতী মহিলা সন্তান প্রসব করেছে। শিশু ও বৃদ্ধরা লবন পানি পান করায় এবং শীতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে পারছেনা। সকলে ক্লান্ত শরীরে এপারে আসা সম্ভব হয়েছে। 

এদিকে, টেকনাফ থানার এসআই অনিমেশ মন্ডল জানান, শাহপরীর দ্বীপ থেকে নতুন করে আসা প্রায় ৭ শতাধিক রোহিঙ্গাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের মানবিক সহায়তা দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পথ পরিবর্তন করে আসা রোহিঙ্গারা নিজেদের উদ্যোগে রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছুটছেন বলেও জানা গেছে।

এসজে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়