• ঢাকা শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫

‘আমার নাতিটা ছাড়া কেউ বেঁচে নেই’

মুহাম্মদ শাহীনুজ্জামান
|  ০৩ অক্টোবর ২০১৭, ১৮:১৩
আমেনা খাতুন (৬০)। কদিন আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। আশ্রয় নিয়েছেন বালুখালি শরণার্থী ক্যাম্পে। সেখানে সোমবার সকালে ত্রাণ নেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। সঙ্গে এক শিশু। কথা বলতে গিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন, ‘আর কেউ নাই, হালি উগ্যা নাতি আছে দে’ (আমার কেউ বেঁচে নেই, শুধু নাতিটা ছাড়া)।

তিনি জানান, তারা যেখানে থাকতেন সেই মংডুর বলিবাজারের কাছে হোয়াইক্ষ্যংয়েই তার দুই ছেলে,  স্বামী আবুল হোসেনকে (৬৫) হত্যা করেছে বার্মার মিলিটারিরা। আট বছর বয়সী নাতি মোহাম্মদ রফিককে নিয়ে পাঁচদিন হেঁটে কোনো রকমে প্রাণটা বাঁচিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। রফিকের মা আবেদা খাতুন এবং বাবা রশিদ আহমেদকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন এতিম নাতিটার কি হবে?  আর এই বয়সে তাকেই বা কে দেখবে?  এই দুঃশ্চিন্তা ক্রমেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে।

এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টার সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ’ (আইএসসিজি) গেলো ২১ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের মধ্যে ৪ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। বয়সের ভারে অনেক রোহিঙ্গাই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারেননি। সেক্ষেত্রে বৃদ্ধা আমেনা খাতুন বেশ সৌভাগ্যবান যে তিনি অন্তত পালিয়ে আসতে পেরেছেন। তবে বার্মার মিলিটারির হত্যাযজ্ঞের সেই দুঃসহ স্মৃতি তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। বারবার শুধু বলছিলেন, ‘ওহ মেরে ফেলেছে, কেটে ফেলেছে,  জ্বালিয়ে দিয়েছে।’   

তিনি বর্ডার পেরিয়ে আশ্রয় পেয়েছেন  উখিয়ার বালুখালি শরণার্থী এই ক্যাম্পে। ত্রাণের লাইনে এত ভিড় ঠেলে দাঁড়াবার সামর্থ নেই। তাই এই বৃদ্ধ বয়সের সম্বল তার নাতি রফিকই ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়েছে। পাশে তিনি অপেক্ষা করছিলেন। কেউ একজন এসে একটা তেলের বোতল দিয়ে গেছে সেটা নিয়েই অপেক্ষা কখন  নাতি রফিক ত্রাণ নিয়ে ফিরবে।

তিনি আরো জানান, রাখাইন থেকে সহায় সম্বল কিছুই আনতে পারেননি। সব পেছনে ফেলে আসতে হয়েছে। তবে বর্ডারে আসার সময় তার কাছ থেকে কেউ টাকা নেয়নি।

আমেনা খাতুন বলেছেন, ‘গ্রামের সুন্দর সুন্দর মেয়েদের ওদের আস্তানায় ঢুকিয়ে ধর্ষণ করেছে। তারপর পুড়িয়ে ফেলেছে।’

তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গেলো বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল দাবি করেছে রাখাইনে কোনো ধরনের ‘গণহত্যা’ চলছে না। তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে চীন এবং রাশিয়া। তবে বৃদ্ধা আমেনা খাতুনসহ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যে সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাতে স্পষ্টতই বোঝা যায় সেখানে নির্বিচারে ধর্ষণ, গণহত্যা  চলছে।

তবে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র,  ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো আমেনা খাতুনদের কথাই বিশ্বাস করছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হিলি রাখাইনে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের হত্যা ও ধর্ষণের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

তাই বৃদ্ধা আমেনা খাতুনসহ অসংখ্য রোহিঙ্গা শরণার্থী জানেন না  তারা তাদের স্বজনদের হত্যার বিচার পাবেন কিনা?

বার্মায় আর ফিরে যেতে চান কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আমেনা খাতুন বলেছেন, ‘ বাঁচা-মরার মধ্য দিয়ে কোনো রকম পালিয়ে এসেছি। বার্মায় আর যাবো না। আল্লাহ যখন তোমাদের দেশে এনেছে, এখন তোমার যা করো। আমরা ওখানে কেমন করে ফিরে যাবো। এখন তোমরা যদি মেরে ফেলতে চাও মেরে ফেল। যা ইচ্ছা করতে পারো।’

এই বৃদ্ধ বয়সে পায়ে হেঁটে পালিয়ে আসতেও খুব কষ্ট হয়েছে বলে জানালেন, ‘কি কষ্ট করে যে এসেছি। হেঁটে আসতে আমার পায়ের নখটা ওঠে গেছে। গ্রামের মানুষ কে কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ জানে না।

সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মিলিটারিরা প্রথমে পাড়ার উত্তর

দিকে গ্রামের লোকদের জড়ো করেছে। তারপর তাদের মেরে ফেলেছে। এসময় যে যেদিকে পেরেছে পালিয়েছে। যারা পালাতে পেরেছে তারা বেঁচে গেছে। বাকিরা সবাই মারা গেছে।’ বললেন আমেনা খাতুন।

মংডু থেকে আসার সময় আমেনা খাতুনের একটা ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে গেছে। নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়ে মৃত স্বামী এবং সন্তানদের মুখটি আর একবার দেখার। সেই আশা আর পূরণ হয়নি। পেছনে ফেরার কোনো উপায় ছিল না। বাঁচা-মরার লড়াইয়ে পেছনে ফেলে এসেছেন দুঃসহ স্মৃতির এক নিষ্ঠুর জনপদ।

জেবি

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়